জলবায়ু পরিবর্তন,পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট, প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস, প্রাণির খাদ্য সংকট, দুর্বল আইন, চোরা শিকারী, হাওর জলাভূমি ও নদীর নাব্যতা হ্রাস, ভূমিতে অতিরিক্ত বিষ প্রয়োগ,বন্যপ্রাণী নিয়ে বাণিজ্য, মানুষের নির্দয় ব্যবহার এর কারণে প্রকৃতি ও মানবজাতির জন্য জরুরি এই প্রাণবৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। হাতেগুণা কয়েকটি বড় বড় প্রাণীই বাঁচলেই কি প্রকৃতি বাঁচবে? আমরা বাঘ, হাতি, হরিণ, কুমির এসব প্রাণীর কথা যত ভাবি অন্যসব প্রাণীর কথা তত চিন্তা করিনা। কিন্তু সকলপ্রাণের অস্তিত্ব যে আমার প্রকৃতি,পরিবেশের জন্য গুরুত্বপুর্ণ ,মানবজাতির জন্য একান্ত প্রয়োজন তা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
প্রাণের বৈচিত্র্যতাই আমাদের জীবন, উন্নয়ন, শান্তি, সমৃদ্ধি। বৈচিত্র্যতা আছে বলেই আমাদের জীবন এত সুন্দর। এই বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, শ্রদ্ধাবোধের জায়গা তৈরি ও আমাদের জীবনের জন্যই টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন বন ও বন্যপ্রাণি। প্রতিবছর ৩ মার্চ পালন করা হয় বন্যপ্রাণি দিবস।এবছরের প্রতিপাদ্য: মানুষ ও গ্রহের সংযোগ : বন্যপ্রাণি সংরক্ষণে ডিজিটাল উদ্ভাবন অনে¦ষণ। ঈড়হহবপঃরহম চবড়ঢ়ষব ধহফ চষধহবঃ: ঊীঢ়ষড়ৎরহম উরমরঃধষ ওহহড়াধঃরড়হ রহ ডরষফষরভব ঈড়হংবৎাধঃরড়হ.
আইইউসিএনের এক সমীক্ষা মতে বাংলাদেশে ১১৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ি, ৬৩০ প্রজাতির পাখি, ১২৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ২২ প্রজাতির উভচর, ২৬১ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ, ৪৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণ, ৩২৭ প্রজাতির শামুক ঝিনুক, ৬৬ প্রজাতির কোরাল, অসংখ্য পোকামাকড়, ৫০০০ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ যার ভেতর ১৬০ প্রজাতির শস্য রয়েছে। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশী ধানের জাত নামে একটা বইয়ে ১২৪৮৭টি স্থানীয় জাতের ধানের নাম উল্লেখ রয়েছে এছাড়া অপর এক সমীক্ষা থেকে ৩৬৪৫ জাতের পাট জাতের বৈচিত্র্যের কথা বলা হয়েছে।
বনই হচ্ছে প্রাণির জন্ম, বিচরণ, প্রজনন ও বসবাসের উপযুক্ত জায়গা।দেশের জীববৈচিত্র্যেল অফুরন্তভান্ডার হচ্ছে বন।যে জীবনপ্রাণির অবাধ মিউজিয়াম। বনই হচ্ছে জীববৈচিত্র্যেল সংরক্ষণের ধারক ও বাহক। বন আছে বলেই উদ্ভিদ ও প্রাণী বেঁচে আছে। বন শুধু গাছপালাই রক্ষা করে না। সব প্রাণীজগতকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অনেক উন্নত জাতের ফসল উদ্ভাবনের জন্য বন্য প্রজাতির ফসলের জিন সংগ্রহ করা হয়।
বনধ্বংসের প্রধান কারণ হচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি। জ্বালানির চাহিদা পূরণ করছে বনের কাঠ দিয়ে, বসতবাড়ি নির্মাণ, ফসল চাষাবাদ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, নগরায়ণ, জুমচাষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৃক্ষের পরিচর্যার অভাব, পরিবেশদূষণ, পাহাড় কাটা, পাহাড় ধ্বংস, বৃক্ষের রোগ, বনবিধি অমান্য করাসহ বিভিন্ন কারণে বন ধ্বংস হচ্ছে।
বনে পাহাড়ে সচরাচর বিচরণ করতো বনহাঁস, সারস, পেঁচা ময়না, ঘুঘু, চড়ুই, টুনটুনি, কোকিল, বেনেবউ, বউ কথা কও, টিয়া, বনমোরগ, মাছরাঙা, বক, কোয়েল, পাতিকাক, দাঁড় কাক, কাঠময়ূর, বালিহাঁস, চন্দনা, হরিয়াল, কাঁঠঠোকরা, ফেসকুল, বুলবুলি, ঈগল, বাজপাখি, শকুন, হারগিলা, কাইম, ডাহুক। এসবের মধ্যে অনেক পাখিই আজ বিলুপ্তির পথে। গভীর রাতে ডাহুকের মিষ্টি ডাক শোনা যায় না।
সকাল বেলা ঘুঘুর মিষ্টি ডাক শুনে ঘুম ভাঙ্গতো। ব্যাপক নিধনের ফলে এখন আর ঘুঘুর খুব একটা ডাক শোনা যায় না। গারোপাহাড়ে বাঘ, চিত্রা ও মায়া হরিণ, রামকুত্তা, ভোঁদর, বন্যশুকর, খেকশিয়াল মেঘলা চিতা, বাঘডাস গন্ধগোকুল, বড় টিকটিকি, বাদুর, পেঁচা, চিল, কৌড়াপাখি, ভোল্লুক, হরিণ, বানর, চিতাবাঘ, বনবিড়াল, সজারো, বনরুই, শুকর, বনগরু, গুইশাপ, উদবিড়াল, কালিম পাখি ,সোনালি বিড়াল, রামকুকুর, কচ্ছপ, কাউট্টা ,কাচিম,গেছোবাঘ, উল্লুক, সোনাগুইল, হনুমান, খরগোস, গোয়াল , লজ্জাবতী বানর, চশমাপড়া বানর, বন ছাগল, অজগর সাপ, বাঘ নীলগাই ও বন্য হাতি ইত্যাদির দেখা পাওয়া যেত। বর্তমানে এসব প্রাণীর সচরাচর বিচরণ লক্ষ করা যায় না।
কৃষি, নগরায়ন এবং বন উজাড় সহ মানুষের কর্মকান্ডের ফলে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস ও ক্ষতিহয়। বাসস্থানের এই অভাবের কারণে অনেক প্রজাতির বেঁচে থাকা, প্রজনন করা এবং খাদ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। শিল্প, কৃষি এবং বর্জ্র্য থেকে উদ্ভূত দূষণ দ্বারা বায়ু, জল এবং মাটি দূষিত হয়। রাসায়নিক, প্লাসিকের আবর্জনা এবং কীটনাশক প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ কারণ তারা আবাসস্থলকে ধ্বংস করে এবং সমগ্র বাস্তুতন্ত্রকে বিপন্ন করে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যপ্রাণী ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়।
গত পাঁচ দশকে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ৬৫ শতাংশ কমেছে। প্রতি বছর কমার পরিমাণ ২ শতাংশ, এ হারে কমতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৮০ শতাংক বন্যপ্রাণি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন ওয়ার্ল্ড জিওলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডন এবং ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের যৌথ গবেষণাপত্রে।এতে বলা হয় ১৯৭০ সালের পর থেকে বিশ্বে ৫৮ শতাংশ বন্যপ্রাণি হারিয়ে গেছে। এর মধ্যে নদ-নদী, হ্রদ ও জলাভূমিতে থাকা জীবজন্তুই বেশি পরিমাণে নিশ্চিহ্ন হয়েছে। এ জন্য গবেষকরা মানবিক তৎপরতা বৃদ্ধি, আবাসস্থল ধ্বংস, বন্যপ্রাণির ব্যবসা, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কারণগুলোকে দায়ী করেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী পৃথিবীতে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ যে হারে বাড়ছে তার প্রভাবে প্রাণিদের পক্ষে সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটা দায় হয়ে উঠেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বন্যপ্রাণীর উপর নতুন বিপত্তি হিসেবে আর্র্বিভূত হচ্ছে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলেন, আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া বন্যপ্রাণীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি। জনসংখ্যার চাপ ও অর্থনৈতিক কারণে বনাঞ্চলে মানুষের মাত্রাতিরিক্ত বৈধ-অবৈধ হস্তক্ষেপের পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক দুর্যোগে কমে যাচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।দেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে ১১টি প্রজাতি ইতিমধ্যেই চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এ ছাড়া ৪৫টি প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে লজ্জাবতী বানর, পারাইল্লা, বানর, কুলু বানর, উল্লুক, রামকুত্তা, গেছোবাঘ, চিতা বাঘ, উদবিড়াল, ভাল্লুক, শুশুক, বনছাগল, সম্বর, বনরুই , মুখপোড়া হনুমান, বনবিড়াল, মেছোবাঘ, কাঁকড়াভুক বেজি, ভোঁদড়, কালো ভাল্লুক, বাগডাস, মায়াহরিণ।
পাখির মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে লালশির হাঁস ও ময়ূর। অতি বিপন্ন পাখির তালিকায় রয়েছে কালো তিতির, কাঠময়ুর, বাদিহাঁস, বাঞ্চাহাঁস, রাজধনেশ, পাহাড়ি ঘুঘু, হরিয়াল, কোরাল, লালশির শকুন, হাড়গিলা, পাহাড়ি ময়না, মথুরা, কাওধনেশ, ঈগল প্যাঁচা, হট্টিটি, সাদা ঈগল, মদনটাক প্রভৃতি।
বিলুপ্ত হয়েছে মিঠাপানির ও লবণাক্ত পানির কুমির। মেছো কুমির অতি বিপন্ন অবস্থায় টিকে আছে।কচ্ছপ প্রজাতির মধ্যে বড় কাইটা, কাছিম, হলুদ পাহাড়ি কাছিম অতি বিপন্ন। সাপের মধ্যে নির্বিষ গুলবাহার অজগর, বিষধর সাপ চন্দ্রবোড়া অতি বিপন্ন এবং কালকেউটে, গোখরা, ভাইপার, কালনাগিনী, দুধরাজ, সবুজ ডোরা প্রভৃতি বিপন্ন সাপের তালিকায় রয়েছে।
ডোরাকাটা হায়েনা রাজশাহী অঞ্চলে, ধূসর নেকড়ে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে, নীলগাই দিনাজপুর-পঞ্চগড় এলাকায়, বান্টিং বা বনগরু চট্টগ্রাম ও সিলেটে এবং বনমহিষ দেশের সব বনাঞ্চলেই দেখা যেত। এ ছাড়া তিন ধরনের গন্ডার ছিল বাংলাদেশে: সুমাত্রা গন্ডার, জাভা গন্ডার ও ভারতীয় গন্ডার। বাদা বা জলার হরিণকে স্থানীয়ভাবে বলা হতো বারো শিঙা হরিণ। সিলেট ও হাওর এলাকায় দেখা যেত। কৃষ্ণষাঁড় নামে একটি প্রাণী ছিল রাজশাহী ও দিনাজপুর এলাকায়।
মহাবিপন্ন প্রাণীদের তালিকায় রয়েছে বেঙ্গল টাইগার, হাতি, ভোঁদড়, লামচিতা, চিতা, বনরুই, উল্লুক, চশমা পরা হনুমান, বনগরু, সাম্বার হরিণ, বানর, হিমালয়ান ডোরা কাঠবিড়ালি ও কালো ভালুক।
লালমুখ দাগিডানা সিলেটে পাহাড়ি বাঁশঝাড়ে এরা বাসা বাঁধত। বিশেষ জাতের পাহাড়ি বাঁশঝাড় প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ায় পাখিরাও এ দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার একেকটি সারস বাংলার নদীর ধারে ঘুরে বেড়াত। জলাভূমির শামুক ও ঝিনুক ছিল এদের খাবার। মূলত শিকারিদের কবলে পড়ে এই বিশাল পাখিটি হারিয়ে গেছে। দেশে বর্তমানে ২৬৮ টির মতো দেশী শকুন আছে বলে সর্বশেষ তথ্যমতে জানা যায়। তারপরেও মাঝে মাঝে শকুনের লাশগুলো পাওয়া যায় বনের মাঝে। অসুস্থ শকুন লোকালয়ের কাছে এসে পড়ে থাকে। যা আমাদেরকে ভাবিয়ে তোলে। বাংলার বিখ্যাত বালি হাঁস, গোলাপি হাঁস, বড় হাড়গিলা বা মদনটাক, ধলাপেট বগ, সাদাফোঁটা গগন রেড, রাজ শকুন, দাগি বুক টিয়াঠুঁটি, লালমাথা টিয়াঠুঁটি, গাছ আঁচড়া, সবুজ ময়ূর চিরতরে এ দেশ থেকে হারিয়ে গেছে। প্রাণের এই বৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখতে হবে আমাদের প্রয়োজনেই।
মো. অহিদুর রহমান
পরিবেশ কর্মী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী


























