ডেস্ক রিপোর্ট , জনতারআদালত.কম ।।
আজ ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস
”জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো”
মাথা ফাঁটা পাকিস্তানি মেজর ও তার কু-কৃত্তি ,
আমার জীবনে কিছু স্মরণীয় ঘটনা —-
বাঙালি জাতির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে সর্বদলীয় বৈঠকে বাঙালির মুক্তিসনদ ৬ দফা উত্থাপন করেন।
পাকিস্তানের মুসলিম লীগের সরকার ঠিক বুঝেছিলেন মুজিবের ছয় দফায় আছে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের রুপরেখা। তাই লাহোর থেকে আসার পরেই বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবকে ছলে বলে বিভিন্ন দূরবী সন্ধি মূলক চক্রান্তের মাধ্যমে আটক করে জেলখানায় বন্দি করে রাখে। সারা দেশে আন্দোলন, শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো, পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা, ঢাকা না পিন্ডি, ঢাকা ঢাকা স্লোগানে স্লোগানে মুখর। চারদিকে মুসলিম লীগের অত্যাচার নির্যাতন বেড়ে চলেছে।
তখন আমি ত্রিশাল থানায় সেন বাড়ি হাই স্কুলের সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি। আমি ছোট সময়ে জানতে পারি আমার শ্রদ্ধেয় দাদা জনাব মোঃ কুমেদ আলী মুন্সী কট্টর বৃটিশ বিরোধী ছিলেন,তিনি নেতাজি সুবাস বসুর পার্টি করতেন। দাদার মুখে অনেক কিছু শুনেছি, আমার বাবা করতেন বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ। বাবার অনেক সাংগঠনিক কাজকর্ম প্রত্যক্ষ করেছি। এই সোনা ও দেখার মাধ্যমে আমিও একজন তাদের ভাব-আদর্শের নির্ভীক ভক্ত হয়ে গেলাম। যার ফলে ১৯৬৫ সনে বাংলার দুশমন মোনায়েম খান গভর্নর হয়ে মুসলিম লীগের দালালদের মাধ্যমে সেনবাড়ী স্কুলে সভা করতে আসে। মরহুম পিতার নির্দেশে শতাধিক ছাত্র ছাত্রী নিয়ে স্কুল উন্নয়নের দাবিতে স্লোগান দেই। মুসলিম লীগের পান্ডারা বাধা দেয়, ফলে আমরা রাস্তায় শুয়ে মোনায়েম খানের গাড়ি আটকিয়ে দেই, গভর্নর সাহেব আমাদের দাবি মেনে নেন ঠিকই, কিন্তু, পরবর্তীতে স্কুলের নাম পরিবর্তন করে আহমদাবাদ রাখা হয়। মুসলিম লীগের অত্যাচারে আমরা স্কুল ত্যাগ করতে বাধ্য হই। আমরা সাত আট জন সেনবাড়ী স্কুল ছেড়ে নান্দাইল থানার মধুপুর স্কুলে ভর্তি হই। কয়েকদিন পরে আমাকে মধুপুর স্কুল শাখার ছাত্রলীগের সেক্রেটারি নির্বাচিত করে। পূর্ব থেকেই চলে গেছে সেক্রেটারি এ. আই চৌধুরী মুক্তা ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ছিল।
১৯৬৭ সালের ৭ই জুন ৬ দফা দিবসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুক্তি দাবিতে জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ সফল করার জন্য ছাত্রদের বাড়িতে বাড়িতে মিটিং করি। সাধারণ মানুষকে অবহিত করি, বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে আমাদের সহযোগিতা করার জন্য আহ্বান জানাই। পার্শ্ববর্তী স্কুলে গিয়ে মিটিং করি। আমাদের সমাবেশের প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম (সাবেক উপরাষ্ট্রপতি) ও তুখোড় বক্তা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া। সমাবেশ শুরুর আগেই পুলিশ ও পাক সেনাবাহিনী সমাবেশ স্থল মধুপুর স্কুল মাঠে ১৪৪ ধারা জারি করে। হাজার হাজার ছাত্র জনতা মাঠ ঘেরাও করে স্লোগান দিতে থাকে– শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, ৬ দফা মানতে হবে, মানতে হবে । সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও রফিক উদ্দিন ভূঁইয়াসহ নেতৃবৃন্দ পাশের এক বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। নির্দেশ এলো, আমার নেতৃত্বে প্রথম ছাত্রছাত্রীর মিছিল এগিয়ে যাবে সমাবেশ স্থলে। সাথে সাথে মিছিল আরম্ভ করলাম। পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙ্গে এগিয়ে গেলাম। তখন সেনাবাহিনী লালসালু কাপড় দেখালো। কিন্তু ছাত্র-জনতা মানে নাই। পাক সেনাবাহিনী গুলি ছাড়লো, আমরা ইট পাটকেল নিক্ষেপ করলাম। আমার ইটের আঘাতে এক পাক মেজর মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেলো, আমাকে ঘেরাও করে গ্রেফতার করলো। সাথে সাথে শতশত ছাত্র-ছাত্রী রাস্তায় শুয়ে প্রতিবাদ আরম্ভ করলো। আমার মুক্তির দাবীতে স্লোগান চললো। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা পুলিশ ও আর্মিকে ঘেরাও করে ফেললো। ময়মনসিংহ থেকে পাকবাহিনীসহ এক কর্নেল আসলো। মুক্তির দাবিতে স্লোগান চললো, কর্নেল আমাকে উর্দু ভাষায় বললো, আমি ইট মেরেছি কি-না ? আমি বললাম, আমাদের গুলি করার পর আমরা ইট-পাটকেল মেরেছি । আমি তাদের ভাষায় মাসুম বাচ্চা বলে কর্নেল সাহেব আমাকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলো। এবং সেনাবাহিনীর বেরিকেড তুলে নিয়ে চলে যায় এবং যথারীতি আমাদের নেতাদের নিয়ে সমাবেশ সাফল্যমন্ডিত করি। পরে জানতে পারি আহত মেজর সাহেবকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে চিকিৎসা শেষে পাকিস্তানে বদলি করে দেয়।
উক্ত মাথা ফাঁটা মেজর সাহেব ১৯৭১ সালে মার্চ মাসে বাংলায় বদলি হয়ে আবার ময়মনসিংহে প্রবেশ করে। পাক সেনাবাহিনী একুশে এপ্রিল ১৯৭১ সালে ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশ করার পথে আমার বাড়ির কাছে হিন্দু অধ্যুষিত কালির বাজারে প্রবেশ করে শতাধিক লোককে হত্যা করে। সকাল ৯ টার সময় ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ঘাঁটি করে মুসলিম নেতাদের সাথে মিটিং করে ২ ঘণ্টার মধ্যে ট্রেনের দুইটি বগি নিয়ে সেনবাড়ি স্টেশনে এসে আমার বাড়ি ঘেরাও করে আগুন দিয়ে পুঁড়িয়ে দেয়। প্রত্যেক বাড়ি ঘরে লুটতরাজ করে, নারী নির্যাতন করে পাশবিক কার্যকলাপ চালায়। স্বাধীনতার পরে ধৃত রাজাকার ও মুসলিম লীগ নেতাদের মুখ থেকে জানতে পারি, একজন পাক সেনা অফিসার সে শুধু আমাকে খুঁজছে এবং যেভাবেই হোক তারা যেন আমাকে ধরিয়ে দেয়। ভাইসব, আমি জানি ইহারা কি জাত। আপনারাও জেনে রাখুন এরা সুযোগ পেলেই কামড় দেবেই। ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট এর শোকাবহ ঘটনার পর ২০শে আগস্ট আমাকে গ্রেফতার করে পুলিশ কারাগারে বন্দী করে রাখে। সেখানেও সেনাবাহিনীর লোকজন আমাকে মারার জন্য তৎপরতা চালায় কিন্তু আল্লাহর রহমতে বেঁচে যাই। তাই বলি, সাধু সাবধান !
লেখক,
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবুল কালাম
মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা,
যুদ্ধাপরাধী ট্রাইবুনালের একাধিক মামলার বাদী ও সাক্ষী,
সন্ত্রাস দমনে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক পুরস্কৃত (জানুয়ারি ১৯৭৫, গণভবন)


























