রবিউল হাসান লায়ন , জামালপুর, জনতারআদালত.কম । ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ।

ঢাকা থেকে নিখোঁজ জামালপুরের সরিষাবাড়ী পৌরসভার মেয়র ও সরিষাবাড়ী পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ রুকুনুজ্জামান রুকন শ্রীমঙ্গল থেকে উদ্ধার হয়েছেন।
গতকাল বুধবার বেলা ১টার দিকে উপজেলার ৮ নম্বর কালিঘাট ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় থেকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে মৌলভী বাজার জেলার পুলিশ সুপার কার্যালয়ে নিয়ে যায়।উদ্ধাদের পর সরিষাবাড়ী পৌর নাগরিকদের মাঝে আলোচনার ঝড় উঠে যায় , মেয়র নিখোজ হয়েছিল নাকি নিজেই আত্মগোপন করেছিল।
এর আগে শ্রীমঙ্গলের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছাব্বের হোসেন উদ্ধার রুকনের ছবি পাঠিয়ে জামালপুর সরিষাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এজেড সাইয়েদ মোর্শেদ আলীর মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হন। তবে রুকনের এভাবে ফিরে আসা নিয়ে রহস্যের দানা বেঁধেছে তার পরিচিতজন, এমনকি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের মধ্যে। অনেকগুলো কারণের মধ্যে নারীঘটিত কোনো বিষয় রয়েছে বলে খতিয়ে দেখছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।
পৌর মেয়র রুকনের ফিরে আসার প্রত্যক্ষদর্শী শ্রীমঙ্গল ৮ নম্বর কালিঘাট ইউনিয়ন পরিষদের গ্রামপুলিশ অশোক কানু বলেন, ‘‘আমাদের এলাকায় সেনাবাহিনীর মহড়া চলছিল। সকালে একজন লোক এসে বলে, ‘আমাকে বাঁচান। ’ আমি ওই লোকটিকে জিজ্ঞেস করি, ‘আপনি কে?’ তিনি নিজেকে মেয়র হিসেবে পরিচয় দেন। ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। কোন জায়গার মেয়র জানতে চাইলে তিনি নিজের নাম বলেন। এ সময় সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা পত্রিকার ছবির সঙ্গে তার চেহারা মিলিয়ে নেন। পরে তাকে নিয়ে আমরা ইউনিয়ন পরিষদে বসাই। টিএনও, থানার ওসি ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে খবর দিই।
সরেজমিন কালিঘাট ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে থেকে জানা যায়, একটি চেয়ারে বসে আছেন মেয়র রুকন। এ সময় তাকে খুব অসুস্থ দেখাচ্ছিল। স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না তিনি। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে এ প্রতিবেদককে রুকন বলেন, তিনি কীভাবে এখানে এসেছেন তা জানেন না। তিনি মেয়র। বাড়ি সরিষাবাড়ী। তবে তাকে চোখ বেঁধে কালো ‘হাইয়েস’ গাড়িতে করে নিয়ে আসা হয়েছিল বলে মেয়র রুকন জানান। পরে মেয়র রুকনের কথামতো শ্রীমঙ্গল থানার পুলিশ শহরে চেকপোস্ট বসিয়ে ওই কালো গাড়িটির সন্ধানে নামে।
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহ্ জালাল বলেন, গত বুধবার বেলা ১টার দিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৮ নম্বর কালিঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সামনে একটি মাইক্রোবাস থেকে তাকে নামিয়ে দেওয়া হয়। তিনি ইউনিয়ন পরিষদের নিরাপত্তাপ্রহরী ও আয়ার কাছে তার বিস্তাারিত পরিচয় বলেন। পরে তাকে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশ নিরাপদ হেফাজতে নেয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন, মেয়র রোকনের নিখোঁজের নেপথ্যে অনেক কারণ সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। রহস্য উদ্ঘাটনে তার পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। কিছু তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে।মেয়র রুকনকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন। তবে তদন্তের আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, দ্বিতীয় স্ত্রী ছাড়াও এক নারীর সঙ্গে রুকনের যোগাযোগের বিষয়টি এরই মধ্যে জানতে পেরেছেন তারা।
অপহরণ কিংবা আত্মগোপনের সঙ্গে নারীঘটিত কোনো বিষয় জড়িত কি না এই বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন তারা। এর বাইরেও মেয়রের নিখোঁজের সঙ্গে তার পারিবারিক দাম্পত্য কলহ ও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে অংশগ্রহণ করা, অর্থাৎ রাজনৈতিক দ্বন্দ জড়িত থাকতে পারে। প্রথম স্ত্রী কামরুন নাহার হ্যাপীর কাছে তথ্য গোপন করে তিনি বড় ভাইয়ের শ্যালিকাকে বিয়ে করায় তাদের দাম্পত্য কলহ তুঙ্গে ওঠে।
এ ছাড়া চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগরের সঙ্গে তার চলচ্চিত্রে ব্যবসার পার্টনারশিপ রয়েছে। চলচ্চিত্রজগতে চলাফেরার কারণে কয়েকজন মডেলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ থেকে দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গেও তার দাম্পত্য কলহের সৃষ্টি হয়। দুই সংসারে দাম্পত্য কলহের জের ধরে মেয়র রুকন ঢাকা থেকে সরিষাবাড়ীতে তার দাফতরিক কাজ শেষ করে আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। তবে সরিষাবাড়ীতে প্রথম স্ত্রীর বাড়িতে তার যাতায়াত নেই।
প্রকাশ থাকে যে, সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের গাউসুল আজম রোডের বাসা থেকে স্থানীয় পার্কে হাঁটতে যাচ্ছেন বলে বেরিয়ে যান তিনি। এর পর থেকে তার খোঁজ মেলেনি। সঙ্গে থাকা তার মুঠোফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায় বলে পারিবারিক সূত্র জানায়। মৃত্যুর আশঙ্কায় ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার ১২ ঘণ্টা পর ঢাকা থেকে নিখোঁজ হন মেয়র রুকন।
২৪ সেপ্টেম্বর রাত ৯টা ১৩ মিনিটে সরিষাবাড়ী পৌর মেয়র রুকনের ব্যাবহৃত ফেইসবুক সধুড়ৎ ৎঁশধহ আইডি থেকে স্ট্যাটাসে উল্যেখ করেন- ‘তোমাদের এই ভালোবাসা আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। তোমাদের এই ভালোবাসার কাছে মনে হয় আমি হেরে গেলাম নপড়ু আমি তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না। তারপরও বলতে চাই “ভালোবাসি ভালোবাসি” এই ভালোবাসা নিয়েই সবকিছু জয় করতে চাই এবং এই ভালোবাসা নিয়েই মরতে চাই। নতুন প্রজন্মের কাছে আমার আহ্বান যে, আমাকে হত্যা করা হলেও “তোমাদের সিক্ত ভালোবাসা যেন অটুট থাকে এবং আমার উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখবা।” রোববার রাত ৯টা ১৩ মিনিটে ফেসবুকে এই স্ট্যাটাস দেন সরিষাবাড়ী পৌর মেয়র রুকুনুজ্জামান রোকন।
এ স্ট্যাটাস দেওয়ার পরদিন সোমবার সকাল ৯টার দিকে ঢাকার উত্তরার একটি পার্ক থেকে নিখোঁজ হন মেয়র রোকন। তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর তার ওই লেখা নিয়ে এখন তুমুল আলোচনায় ভাসছিল সরিষাবাড়ী । রুকনুজ্জামান রুকন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌকা প্রতিক নিয়ে ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর সরিষাবাড়ী পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই মেয়র রুকন পৌরসভায় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি করে আসছে। ১৮ ফেব্রয়ারী ২০১৬ ইং তারিখে দায়িত্ব গ্রহনের পর থেকেই পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সীলরদের দ¦ায়িত্ব ও কর্তব্য বিধি মালা ২০১০ সালের অনুসারে মেয়র এবং কাউন্সীলররা পৌরসভার অফিস পরিচালনা করবেন।
কিন্তু মেয়র সরকারী ছুটির বিধান লঙ্গন করে শুক্রবার ও শনিবার অফিস করেন। এর ফলে পৌরসভার বিভিন্ন জনগুরুত্ব পুর্ণ কাজ ও ফাইল অনুমোদনের জন্য নাগরিক গণকে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করে ঢাকায় গিয়ে মেয়রের স্মরনাপন্ন হতে হয়েছে। প্রশাসনিক কাজে তদারকি না থাকায় পৌরসভার স্বাভাবিক কাজ কর্মের স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে এবং নাগরিকগণ সেবা থেকে ব্যাপক ভাবে বঞ্চিত ও হয়রানী হয়েছে। শুধু তাই নয় কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল এবং কর্মকর্তা/কর্মচারীদের আট মাসের বেতন ভাতা বকেয়া রেখে মেয়রের ক্ষমতা অপব্যবহার করে পৌর এলাকা এবং পৌর এলাকার বাহিরে স্বেচ্ছাচারিতায় আশ্রয়ে বিভিন্ন সময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পৌরসভার অর্থের বিনিময়ে মক্ষীরানীদের কে দিয়ে অপ সংস্কৃতি তথা অপকর্ম চালিয়ে অমার্জনীয় অপরাধ করেছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ের পরিপত্রের নীতিমালা অগ্রাহ্য করে মাষ্টাররোল বা দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে ২/৩ জন লোক নিয়োগের অনুমোদন থাকলেও উক্ত বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে তার বশংবদ ৩০ জন ক্যাডার/নেশাগ্রস্থকে মাষ্টার রোলে নাম দিয়ে পৌরসভার অর্থ লোপাট করছে,যা বিধি বহির্ভুত।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর সোমবার সন্ধ্যায় মেয়র রুকনের বড় ভাই সাবেক যুবদল নেতা সাইফুল ইসলাম টুকন উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। সাধারন ডায়েরী-নম্বর-১৬১১।


























