ডেস্ক রিপোর্ট, জনতারআদালত.কম । ২৩ আগষ্ট, ২০১৭ ।

বহু চিকিৎসকের গবেষণায় দেখা গিয়েছে ডেঙ্গু সারাতে পেঁপে পাতার রস বিশেষ কার্যকরী। অথচ কীভাবে কাজ করে পেঁপে পাতার রস? কতটা রস খেলে উপকার পাওয়া যায় তা অনেকেরই অজানা। ডেঙ্গু রোগে পেঁপে পাতার নানা অজানা ঔষধিগুণ নিয়ে জানালেন ভারত সরকারের আয়ুর্বেদ গবেষণা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানী, অধ্যাপক ডাঃ সুবলকুমার মাইতি।
ইডিস ইজিপ্টাই নামক মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। এই মশা পরিচ্ছন্ন পানিতে ডিম পাড়ে। স্ত্রী মশার ডিম পাড়ার জন্য রক্তের প্রয়োজন হয়, সেজন্য এই মশা কামড়ায়, অবশ্য দিনের বেলায়। ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষের প্রথম ২-১০ দিনের মধ্যে যদি এই মশা কামড়ায় এবং তা থেকে জীবাণু মশার রক্তে প্রবেশ করে, তাহলে ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে তা মশার লালায় চলে আসে, তখন কোনও সুস্থ মানুষকে কামড়ালে, সেই মানুষ ডেঙ্গুর কবলে পড়ে। শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস ঢুকলে প্রবল জ্বর, মাথার যন্ত্রণা, পেশিতে ও বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা, গায়ে লাল র্যাশ ও চুলকানি প্রভৃতি দেখা দেয়।
এই চিকিৎসার জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট কোনও ওষুধ নেই। বিভিন্ন ঔষধ প্রয়োগের দ্বারা, যেমন জ্বরনাশক প্যারাসিটামল, ভিটামিন প্রভৃতির দ্বারা চিকিৎসা চলে। এক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন অথবা আইবুপ্রুফেন জাতীয় ঔষধ চিকিৎসকগণ নিষিদ্ধ করেছেন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার জন্য। ডেঙ্গুতে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা চলতে থাকে। রোগী সুস্থও হয়ে যান। তবে ডেঙ্গু ভাইরাল বোন ম্যারোর মেগাক্যরিওসাইটকে অকেজো করে রক্তের অনুচক্রিকাকে ধ্বংস করে। ফলে প্লেটলেট কমতে থাকে। এবং রোগীর অবস্থা আয়ত্তের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তখন রোগীকে বাইরে থেকে প্লেটলেট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। প্লেটলেট ৫০ হাজারের নিচে নেমে গেলে শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হতে শুরু করে।
এক্ষেত্রে আয়ুর্বেদ চিকিৎসকগণের একাংশ মনে করেন—পেঁপে পাতার রস সকালে খালি পেটে গুড় বা মধুর সঙ্গে খেলে প্লেটলেট বাড়তে থাকে। ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ একেবারেই চলে যায়। অন্য গবেষণায় ধরা পড়েছে, রোগের পুনরাক্রমণ ঘটে না। কেরল, তামিলনাড়ু প্রভৃতি রাজ্যে এই চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রচলন অধিক। সকালে ২৫ মিলি এর মতো পেঁপে পাতার রস পান করতে হবে। আবার বিকেলে ২৫ মিলি। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ঔষধ প্রস্তুতকারক সংস্থা পাতার রস থেকে ক্যাপসুল ও সিরাপ তৈরি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে।
তবে শুধু রস খেলেই চলবে না। সারাদিনে প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে। এছাড়া ফলের রসও পান করা যেতে পারে।
এখন দেখা যাক—পেঁপে পাতায় এমন কী আছে, যা ডেঙ্গুকে প্রতিহত করতে পারে, প্লেটলেট বাড়াতে সাহায্য করে।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে—প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে পেঁপে বা পেঁপে গাছের কোনও বর্ণনা পাওয়া যায় না। কারণ এটি দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, দক্ষিণ মেক্সিকো ও কোস্টারিকার গাছ। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি স্পেনদেশের বণিকরা এই গাছ ম্যানিলাতে নিয়ে আসেন, তারপর বিশ্বের বিভিন্ন উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে বা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় শ’চারেক বছর এদেশে এসেছে। তারপর বিভিন্ন গবেষক বিভিন্ন নামকরণ ও গুণের বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে কাঁচা ও পাকা পেঁপে, পেঁপের বীজ ও আঠার গুণাগুণ লিপিবদ্ধ হয়েছে। পাতার গুণাগুণ তারও পরে লোকায়তিক ব্যবহার থেকে এসেছে।
পরবর্তী নানা সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে—পেঁপের শুকনো পাতা ভিজিয়ে পানি খেলে পাকস্থলীর ক্রিয়া ঠিক থাকে। পাতার রস—ক্রিমিনাশক, বিরেচক অর্থাৎ পেট পরিষ্কার রাখে, স্নায়ুগত ব্যথানাশক (বাহ্যপ্রয়োগে)ও প্রবল জ্বরের মতো(জ্বরের বেগ, বমি, মাথার যন্ত্রণা) প্রভৃতি উপসর্গে ব্যবহার্য। পেঁপে পাতা বিভিন্ন দেশে প্রতিষেধক ও প্রতিকারমূলক ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বর্তমানের বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে—১) পেঁপে পাতার রসে কাইমোপেপিন ও পেপিন নামক দুটি এনজাইম থাকায়, তা রক্তে প্লেটলেট বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এটি যেমন রক্তকে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে, তেমনি ডেঙ্গুর অন্যান্য লক্ষণকে দূর করে। পাতার রসে থাকা প্রায় পঞ্চাশটি যৌগের মধ্যে কারপ্যান যৌগ সমূহ ফাংগাস, পরজীবী, জীবাণু ও ক্যানসার ধ্বংস করতে পারে। এত ট্যামিন থাকায় অসুখের পুনরাক্রমণের সম্ভাবনাও কম। ভাইরালঘটিত সর্দি-কাশি জ্বরকে প্রতিহত করতে পারে।
এছাড়া এই যৌগগুলি শ্বেতকণিকা ও প্লেটলেট বৃদ্ধি করে। পেঁপে পাতার রস কাইমোপেপিন, পেপিন, কারপ্যান, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, কার্বোহাইড্রেট, ফসফরাস, আয়রন, ক্যালরি, ভিটামিন-এ,বি১, সি, ই প্রভৃতি পাওয়া যায়। ভিটামিন-এ, সি, ই রোগ প্রতিরোধক। ডেঙ্গু রোগ সারানোর জন্য পেঁপেপাতার রস ব্যবহারের ওপর বিভিন্ন গবেষণা পত্র থেকে জানা যায় যে, কাইমোপেপিন ও পেপিন ডেঙ্গুর সমস্ত উপদ্রবকে কমিয়ে দিতে পারে এবং প্লেটলেট বৃদ্ধি করে। চিকিৎসকগণ ডেঙ্গুর দ্রুত আরোগ্যের জন্য ২০-২৫ মিলি রস দিনে ২ বার করে ৭ দিন খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এটির কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।
জার্নাল অব অ্যাথনোফার্মাকোলজির গবেষণায় জানা যায় যে, কয়েকটি এমন এনজাইম এই পাতার রসে রয়েছে যা কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই ক্যানসারের সবরকম টিউমারের বিরুদ্ধে দ্রুত কাজ করতে পারে। উদাহরণ হিসাবে সারভিক্স, ব্রেস্ট, লিভার, লাং ও প্যানক্রিয়েটিভ ক্যানসারের কথা বলা যেতে পারে। বিশ্বের বহু দেশে কেমোথেরাপির সঙ্গে এটি ব্যবহৃত হয়। এটি ক্যানসারের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতাও গড়ে তোলে। পেঁপের বীজও ডেঙ্গুনাশক। সাধারণ ও হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে পাতার রস কার্যকর এবং প্লেটলেট বৃদ্ধি করে—পি রামমনোহর মহাশয়ের গবেষণাপত্রে উল্লেখিত হয়েছে এই তথ্য।
ডাঃ নবীন খান্নার ১৭ বছরের গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায় যে, আকনাদি লতার পাতা (বোটানিক্যাল নাম Cissampelos pareiraj) ডেঙ্গু, ভাইরাসকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম এবং এটির কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। এই লতা গাছটির আলোচনা বহু প্রাচীনকাল থেকে এবং অথর্ববেদে উল্লেখ আছে। নানাবিধ রোগে, বিশেষ করে মেয়েলি নানা সমস্যায় এটি ব্যবহৃত হলেও পিত্তজ্বরে (শরীরে দাহ, চোখ লাল, বারবার পিত্ত বমি, অসাড়ে পায়খানা) আফগানি পাতার ব্যবহার দেখা যায়।
পানিতে আকনাদি পাতা সিদ্ধ করে ওই পানি খেয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত গবেষক ও তাঁর কন্যা ডেঙ্গুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন। খেতে হয়েছিল ৩ দিন। আকনাদি থেকে প্রস্তুত ঔষধের পেটেন্ট নেওয়ার জন্য ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে বেশ কিছু ওষুধপ্রস্তুতকারক সংস্থা সবধরনের নথি জমা দিয়েছে।
এছাড়া ১৯টি গাছপালা নিয়ে তৈরি ওষুধের (ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য) জন্য গবেষণা চলছে। ডেঙ্গু প্রতিষেধক হিসেবে একটি ভ্যাকসিনও আবিষ্কার করে ফেলা হয়েছে, যেটি ডেঙ্গুর চার রকমের ভাইরাসকে প্রতিহত করতে পারবে এবং ইন্টারন্যাশনাল পেটেন্টের জন্য নথিপত্র জমা হয়ে গিয়েছে। অনুমতি পেলে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল আরম্ভ হবে।
অধিকাংশ রাসায়নিক ওষুধ একটি মাত্র মলিফিউল দিয়ে প্রস্তুত হওয়ার ওষুধটির বিরুদ্ধে সহজে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে, ওষুধটি তখন অকেজো হয়ে পড়ে। ভেষজ ঔষধের ক্ষেত্রে নানাবিধ মলিকিউল থাকায় সেটির বিরুদ্ধে সহজে প্রতিরোধ (রেজিস্ট্যান্স) ক্ষমতা তৈরি করতে পারে না—এটি ডাঃ খান্না এবং তাঁর অন্যান্য গবেষকগণের অভিমত।
ফিরে আসি পেঁপের পাতায়। আলোচ্য বিষয় যেহেতু ডেঙ্গু ও পেঁপের পাতা নিয়ে, সেহেতু পেঁপে পাতার আরও অজস্র গুণ এবং কাঁচা ও পাকা পেঁপে, পেঁপের আঠা, পেঁপের বীজ প্রভৃতির গুণাগুণ নিয়ে এখানে আলোচনা হল না। এই সবগুলির ভেতর একই গুণের সমাহার হয়েছে। তাই বুঝি এর অনেক নামের মধ্যে দুটি হল অমৃতাতুম্ভী ও স্বর্ণকুম্ভ!
শেষে বলি—দেশি ট্র্যাডিশনাল বলে নাক সিঁটকানোর দিন আর নেই, সত্য বিচারের চাবিকাঠি আজ বিজ্ঞানের ঝুলিতে, একটু পরখ করতেই বা কতক্ষণ!


























