spot_img

সাতচল্লিশে সিলেট কীভাবে পাকিস্তানের অংশ হল ?

ডেস্ক রিপোর্ট, জনতারআদালত.কম । ১৮ আগষ্ট, ২০১৭ ।

 

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ করে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত হলেও প্রশ্ন ওঠে আসামের অংশ সিলেটের ভাগ্যে কী হবে।

মুসলমান আর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারতকে ভাগ করার যে দায়িত্ব পড়েছিল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ওপর।

১৯৪৭ এর ৩রা জুন এক ঘোষণায় তিনি সিলেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারনের দায়িত্ব দেন স্থানীয় জনসাধারণের কাঁধে। সিদ্ধান্ত হলো গণভোট অনুষ্ঠানের।

এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ই জুলাই সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে মোট ভোটার ছিল ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮১৫ জন। ভোট দিয়েছিল ৭৭ শতাংশ মানুষ।

২৩৯ টি ভোটকেন্দ্রে বড় কোনো ঝামেলা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছিল বলেই জানা যায়। ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী সিলেটে গণভোট সংক্রান্ত কার্যক্রমের বৈধতা দেয়া হয়েছে।

সিলেটের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য গণভোট অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়সিলেটের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য গণভোট অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়

দেশভাগের সময় ৫ম শ্রেণীর ছাত্র জকিগঞ্জের মোহাম্মদ নুরউদ্দীনের মনে রয়েছে সেই ভোটের কথা। মোহাম্মদ নূরউদ্দীন তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলেন করিমগঞ্জের প্রাথমিক স্কুলে।

ভোটে করিমগঞ্জের মানুষও আসাম ছাড়ার রায় দিলেও করিমগঞ্জের কিছু অংশ র‍্যাডক্লিফ লাইনে ভারতের আসামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

“আমরা বাইরাইয়া মিছিল দিছি করিমগঞ্জে। মসজিদ যেখানে ছিল সেখানে স্লোগান নাই। এইভাবে করছি। ভোটে আমরা করিমগঞ্জকেও পাইছি। এই যে সাড়ে তিন থানা গেল সবটা পাইছি। কিন্তু আমাদের নেতাদের অভাবেই কংগ্রেস বড়লাটের লগে মিল করিয়া নিয়া গেছে।”

কুশিয়ারা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে নূরউদ্দীন বলেন, তার নানা বাড়ী, ভগ্নীপতিসহ অনেক আত্মীয়ের বাড়ী পড়ে যায় করিমগঞ্জে আর তারা থাকেন পূর্ব বাংলায় বর্তমান জকিগঞ্জ এলাকায়।

“আত্মীয়স্বজন সবাই থাইকা গেছে। ইন্ডিয়ায় থাকছে। এখনো আছে। আমরার যাওয়া আসা নাই। তারাও আসে না।”

মাহতাবউদ্দীন আহমেদ                       
                              মাহতাবউদ্দীন আহমেদ

 

সিলেটের গণভোট দেখেছেন মাহতাবউদ্দীন আহমেদও। মনে করে বলেন সেই কিশোর বয়সে বড়দের সঙ্গে পাকিস্তানের পক্ষে কী স্লোগান দিতেন তারা।

“মুসলীম লীগের মার্কা কী- কুড়াল ছাড়া কী, পাকিস্তান জিন্দাবাদ-লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান, কায়দে আজম জিন্দাবাদ এইগুলা স্লোগান ছিল।”

মাহতাবউদ্দীন জানান ভোটের প্রচারে সিলেটে মুসলিম লীগের বড় নেতারা এসেছেন। তার মনে আছে সিলেটের শাহী ইদগায়ে মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহও এসেছিলেন।

দাবি করলেন গণভোটের প্রচারে এসে করিমগঞ্জে তাদের বাড়ীতে একবেলা খেয়েছিলেন তৎকালীন তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১২জন কর্মী।

“কংগ্রেসের মার্কা ছিল ঘর আর মুসলীম লীগের ছিল কুড়াল। হিন্দুদের মধ্যে নমোশূদ্ররা ছিল মুসলীম লীগের পক্ষে। আলেমদের একদল ছিল কংগ্রেসি। হুসেইন আহমেদ মাদানী উনি আর ওনার একটা গ্রুপ ছিল কংগ্রেসি।”

র‍্যাডক্লিফ লাইন কিন্তু সিলেটের মানুষের কাছে বিতর্কিতই রয়ে গেছের‍্যাডক্লিফ লাইন কিন্তু সিলেটের মানুষের কাছে বিতর্কিতই রয়ে গেছে

দেশভাগের ইতিহাসে সিলেটের গণভোট এক বিরল ঘটনা। এই ভোটে জয়ী হতে মুসলীম লীগের ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালায়। সিলেটের জনগণকে পাকিস্তানের পক্ষে ভোটদিতে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল মুসলীম লীগ।

পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়া ফরজ ঘোষণা করে ফতোয়াও জারি করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইয়ে উল্লেখ রয়েছে গণভোটের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান পাঁচশো কর্মী নিয়ে কলকাতা থেকে সিলেট এসেছিলেন।

শেখ মুজিব লিখেছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুরোধে হিন্দু রায়বাহাদুর আরপি সাহা একাধিক লঞ্চ সিলেটে পাঠিয়েছিলেন মুসলীম লীগের পক্ষে। লিখেছেন সিলেটে গণভোটে জয়লাভ করে তারা আবার কলকাতা ফিরে যান।

শিক্ষাবিদ ও সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলীম সাহিত্য সংসদের সভাপতি অধ্যাপক মো. আব্দুল আজিজ তখন ষষ্ঠ শ্রেনীর ছাত্র।

তিনি বলেন, “মুসলমানদের জন্য গণভোট পরিচালনার জন্য একটা রেফারেন্ডাম বোর্ড হয়। সেই বোর্ডের সভাপতি হলেন আব্দুল মতিন চৌধুরী নামে একজন প্রবীণ নেতা। যিনি এককালে জিন্নাহ সাহেবের খুব ঘনিষ্টজন ছিলেন। আর সেক্রেটারি হয়েছিলেন অ্যাডভোকেট আব্দুল হাফিজ যিনি বর্তমান অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেবের বাবা।”

সিলেটের শিক্ষাবিদ মো. আব্দুল আজিজ                        সিলেটের শিক্ষাবিদ মো. আব্দুল আজিজ

তার কথায় সিলেটে ৬০ ভাগ মুসলিম থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের একটি অংশ কংগ্রেসপন্থী হওয়ায় ভোটের প্রচার প্রচারণার প্রয়োজন হয়।

“পাকিস্তানের পক্ষে পড়লো ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ ভোট আর ভারতে যোগদানের পক্ষে পড়লো ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১ ভোট। মুসলীম লীগ ৫৫ হাজার ৫শ ৭৮ ভোট বেশি। এজন্য সিলেটিরা গর্ব অনুভব করতো যে আমরা বাই চয়েস পাকিস্তানে আসছি।”

১৯৪৭-এ সিলেটের ঐতিহাসিক গণভোটেই ঠিক হয় পূর্ব পাকিস্তানের একাংশের মানচিত্র।

কিন্তু গণভোটের রায় না মেনে মানচিত্রে দাগ কেটে করিমগঞ্জের কিছু অংশ ভারতকে দিয়ে দেয়ায় সিলেটের মানুষের কাছেও চির বিতর্কিত হয়ে যায় র‍্যাডক্লিফ লাইন।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

সর্বশেষ