বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম, প্রকাশক ,
জনতারআদালত.কম । ৩১ আগষ্ট, ২০১৭ ।

আমার গ্রামের নাম কানিহারী। গ্রামটি চতুর্দিকে সবুজে ঘেরা ও আয়তনে অনেক বড়। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। ৩৬০ ঘর হিন্দু বসবাস করতো। ভারতবর্ষের ইতিহাসে এখনও উক্ত গ্রামের ঐতিহ্য জ্বলজ্বল করছে। মুসলমান ঘরের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমই ছিলো। আমাদের প্রসিদ্ধ এলাকায় ছিলো- হিন্দু জমিদার, তরফদার, চৌধুরীবাড়ি, চক্রবর্তী বাড়ি ও ঠাকুরবাড়ি। তাদের ছিলো অনেক দাপট ও ক্ষমতা। জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে জুতা পায়ে ও ছাতা মাথায় কেউ চলাফেরা করতে পারতো না।
আমার দাদার নাম ছিলো- মোঃ কুমেদ আলী মুন্সী। দাদা ছিলেন খুবই স্বাধীনচেতা পুরুষ, অত্যন্ত পরহেজগার ও ধার্মিক। তিনি মুসলিম লীগ বিরোধী রাজনীতি করতেন। তিনি খুবই তেজস্বী পুরুষ এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন।তিনিই একমাত্র পুরুষ ছিলেন যিনি জমিদার বাড়ীর সামনে দিয়ে জুতা পায়ে দিয়ে এবং ছাতি মাথায় দিয়ে চলতেন । কিন্তু, হিন্দু-মুসলিম সবার সাথে দাদার খুব সদ্ভাব ছিলো। আমি যখন ৩য় শ্রেণিতে পড়ি, শুনেছি হিন্দু ছাত্রদের সাথে মুসলমান ছাত্ররা লেখাপড়া করতে খুবই অসুবিধার সম্মুখীন হতো। তবে, এই দিক দিয়ে আমাদের এলাকা ছিলো ভিন্ন। হিন্দু-মুসলমানদের মাঝে ছিলো সম্প্রীতির সম্পর্ক।
আগেই বলেছি, আমার দাদা ছিলেন খুবই স্বাধীনচেতা পুরুষ, তাঁর ছিলো খুব প্রভাব-প্রতিপত্তি। দাদাকে হিন্দুসমাজ খুবই সমীহ করতো। হয়তো এ কারণেই আমার সাথে হিন্দু ছেলেদের সম্পর্ক ভালো ছিলো। হিন্দুদের যেকোনো অনুষ্ঠানে ক্লাসের হিন্দু বন্ধুরা আমাকে দাওয়াত দিতো। হিন্দুরা যা যা খেতো বা পরতো, আমরাও তাই করতাম। আমাদের বাড়িতেও তাদের দাওয়াত করে খাওয়াতাম। হিন্দুরা মুড়ি-মুরকি, লাড্ডু-নাড়ু দিতো আপ্যায়নের শুরুতে। তারপর খাওয়াতো লুচি আর লাবড়া। বর্তমান প্রজন্ম হয়তো জানেও না, “লাবড়া” কাকে বলে।

লাবড়া হলো- ২০/২৫ জাতের সবজি দিয়ে তৈরি করা এক প্রকার সুস্বাদু খাদ্য। রকমারি মসলার সাথে এটি রান্না করা হতো। তবে, বেশি খেলে এটি তেঁতো লাগতো কিছুটা। তখনকার সমাজে ছিলো এর বেশ প্রচলন। অনেকেই লাবড়া খাওয়ার জন্য হিন্দুবাড়িতে যেতো, তবে একবারের বেশি তা খেতো না। একে কেউই তরকারী মনে করতো না। কারণ, এতে কোনো প্রকার মাছ বা মাংস দেয়া থাকতো না। নানান সবজি উপকরণ দিয়ে তৈরি হতো বলেই একে লাবড়া নাম দেয়া হয়।
যেমন লাবড়া কোনো তরকারী নয়, ঠিক তেমনি বিএনপি নামক সংগঠনটিও কোনো রাজনৈতিক দল হতে পারে না।এই বাক্যটি আমার আজকের লেখার চুম্বকাংশ করার কারণ, একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয় একই মতের ও পথের লোকজনদের নিয়ে, কিন্তু এই সংগঠনটিতে হরেক মতান্তের লোকের বাস। ভিন্ন ভিন্ন আদর্শের লোকেরা জোট হয়েছে এ সংগঠনটিতে। যার জন্মস্থান সেনানিবাসে মইনউদ্দিন রোডের জেনারেল জিয়ার বাসভবনে।
জেনারেল জিয়া তখন অবৈধভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করে রাষ্ট্রপতি হন। সংবিধান লঙ্ঘন করেই তখন সুপ্রিম-কোর্টের প্রধান বিচারপতি অবৈধ রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে শপথ পাঠ করান। দুর্ভাগ্য বাঙ্গালী জাতির, দুর্ভাগ্য আমাদের- আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক- জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে চক্রান্ত করেই জেনারেল জিয়া বেনিফিসারি হিসাবে অবৈধ রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। আমি তখন ময়মনসিংহ শহরে থাকি। ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আমি।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে ঘাতকরা হত্যা করার পর আমাকে নিরাপত্তা আইনে পুলিশ আটক করে। আমার শ্রদ্ধেয় বাবা তখন অনেক জমিজমা বিক্রি করে কয়েকমাস পর আমাকে সেখান থেকে মুক্ত করে আনেন। একটা পর্যায়ে রাষ্ট্রপতিকে জোরপূর্বক বৈধ করার জন্য- “হ্যাঁ-না” গণভোটের আয়োজন করে। আর্মি দিয়ে শহরে-শহরে মাইকিং করা হয়, ঘোষণা দেয়া হয়- যেনো সবাই ভোট দিতে কেন্দ্রে যায়, আর যদি কেউ ভোট দিতে না যায় তবে তাকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যাবে।
আমি নিয়ত করলাম, আমিও ভোট দিতে যাবো- পরিস্থিতি জানার জন্য। আমার ভোট দেয়ার কেন্দ্র ছিলো ময়মনসিংহের সিটি স্কুলে। আমি সবার পরে আনুমানিক দুপুর ১টা থেকে ২টার মধ্যে ভোট দিতে গেলাম। ভোটের বুথে প্রবেশ করলাম, দেখলাম- সরকারি অফিসাররা বসে আছে। মাত্র ২টা ব্যালট-বাক্স দেখলাম। একটির উপর লেখা আছে- “হ্যাঁ”, অন্যটির উপর- “না”। সেখানকার লোকজন সবাই আমাকে চেনে। বাক্স দু’টি আমি কৌতূহল বশত দেখছিলাম। সরকারি লোকজন বললো, ভাই তাড়াতাড়ি ভোট দিয়ে চলে যান, এখনই আর্মিরা চলে আসবে।
আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বিবেকের তাড়নায় “না” বাক্সের দিকে ভোট দিতে যাই। তখনও “না” -বাক্সে কোনো ভোট পড়েনি। “না” –বাক্সের মুখে মাকড়শার জাল। আমি কয়েকটা ফু দিয়ে “না” –বাক্সের মুখটি পরিষ্কার করলাম এবং “না-ভোট” দিলাম। দেখলাম, সেখানে থাকা প্রায় সকল সরকারি কর্মকর্তারাই খুশি হলেন। এই “না-ভোট” দেয়ার কারনে ডি.বি. পুলিশ কিছুদিন পর আমার বাসায় হানা দেয়। আমি তখন বাসা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হই। পরবর্তীতে আমার এক আত্মীয় পুলিশ কর্মকর্তা ব্যাপারটি বহু কষ্টে সুরাহা করেন।
বর্তমান বিএনপি নেতারা কি জানেন, তাদের স্থপতি কী ধরণের গণতন্ত্র তখন চালু করেছিলেন ? কিভাবে গণমানুষের স্বাধীনতা হরণ করেছিলেন ? জিয়ার ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভাগাভাগি করার জন্য হরেক রকম চরিত্রের লোকজনের মিলনমেলায় পরিণত হতে থাকে তাদের দল।
জিয়াউর রহমান বলতেন, “ মানি ইজ নো প্রোব্লেম “ । তার এই কথা শুনে অনেকেই তখন ক্ষমতার হালুয়া-রুটির লোভে তার দলে যোগদান করে ।

জিয়া প্রথম গঠন করেন- জাগোদল। এরপর তা বিএনপি -তে রুপান্তর করেন। এতে সমাবেশ ঘটে- মুসলিম লীগ, রাজাকার, আলবদর, আলশামস, সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী, ভাসানী পার্টি, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের লোকজন, অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর লোকজন, চরমপন্থি, ক্ষমতালোভী বিপ্লবী পার্টি এবং আওয়ামীলীগ ও বাংলাদেশ বিরোধী- পাকিস্তানপন্থি লোকেরা। এভাবেই সমন্বয় করে গঠিত হয়- বি.এন.পি।
এদের একজনের সাথে আরেকজনের কোনোরূপ মত-পথ বা আদর্শের মিল ছিলো না, বর্তমান দলটিতেও নেই। এরা ক্ষমতায় এসে শুরুতে বেশ প্রশংসনীয় উন্নয়নের প্রলাপ বকেছিলো। অনেক আশার আলো দেখিয়েছিলো। মনে হয়েছিলো যেনো, স্বর্গ থেকে আল্লাহ্র ফেরেশতারা নেমে এসেছে। কিন্তু, কিছুদিন পরেই তাদের আসল চেহারা জনগণের কাছে উন্মোচিত হয়। খুলে যায় মুখোশ। বেরিয়ে আসে প্রকৃত রূপ, প্রকৃত চেহারা।
আগেই বলেছি, লাবড়া আর বিএনপি –এর মাঝে কোনো তফাৎ নেই। বিএনপি নেতাদের কোনো আদর্শই নেই। এরা একেকজন একেক দল থেকে এসেছে। এরা একত্র হয়েছে শুধুই ক্ষমতা আর লুটপাটের জন্যে। এখন প্রায় ১০/১২ বছর যাবত ক্ষমতার বাইরে আছে তারা। লুটপাটের টাকা প্রায় শেষ। তাই তারা উন্মাদ হয়ে গেছে। তাইতো, গুলশানের শতশত কোটি টাকার সম্পত্তি –উচ্চ আদালতের নির্দেশে দখল ছাড়তে হয়েছে ডিগবাজীতে ওস্তাদ ব্যারিস্টার সাহেবের। তিনি যখন কথা বলেন, মনে হয় তার মতো ভদ্রলোক আর দ্বিতীয়টি পাওয়া যাবেনা এই বাংলাদেশে। কূটচালে মহাওস্তাদ ব্যারিস্টার সাহেব কী সুচারুভাবে সরকারের সাথে উচ্চ আদালতের বিবাদ বাধিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারার কাজটি পাকাপোক্ত করেছেন।

দেশবাসী অবশ্যই জানে- আপনি একজন বর্ণচোরা রাজনীতিবিদ। আপনি অনেক দুর্নীতি করেছেন। মামলাও খেয়েছেন। জেল-হাজতও খেটেছেন। চতুরতার সাথে জনগণের সাথে বেইমানী করে নিজের স্বার্থে বিভিন্ন সরকারের মন্ত্রীসভায় স্থান করে নিয়েছেন। উচ্চ আদালতের সাথে সরকারের এই চলমান বিরোধ যে আপনারই সৃষ্টি, তা জনগণ ভালোভাবেই জানে। সরকারও অবগত আছেন। তাই বলছি, সাধু শয়তান – সাধু সাবধান !


























