মানুষের অবিবেচনাসুলভ কর্মকান্ডের ফলে পৃথিবীর বৃহত্তম ১৫ তম জলধারা ব্রহ্মপুত্র নদ ও বাংলাদেশের তথা পৃথিবীর প্রায় সব নদ-নদী এখন হুমকির সম্মুখীন। দখল, দূষণ, নগরায়ন, অপরিকল্পিত খনন,ব্রীজ, বাঁধ, পানিপ্রবাহ, ভিন্নমুখকরণ, অতি আহরণ, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি এক বা একাধিক কারণে লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো, কলোরাডো, হার্ডসন (যুক্তরাষ্ট্র), টেমস (যুক্তরাজ্য), দানিয়ুব, রাইন (ইউরোপ),নিল (মিসর), হোয়াংহো, ইয়াংসি (চীন),সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র (ভারতীয় উপমহাদেশ) ইত্যাদি নদ-নদী এবং এগুলোর শাখা-প্রশাখাসহ পৃথিবীর জলধারা এখন মহাসংকটে। বাংলাদেশের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ এখন যেন মরালাশ।
নদী, নালা, খাল, বিল, হাওর, ডোবা, জল জলাশয়, ২৭১টি নদ-নদী ১৩৫ টি হাওর, শত শত পুকুরে ঘেরা ময়মনসিংহ গীতিকার চারনভূমি,মহুয়া মলুয়ার, কাজলরেখা, বীরঙ্গনা সখিনা, চন্দ্রাবতি কাহিনী খ্যাত,তলার হাওর,বাঘবার হাওর, ডিঙ্গাপোত হাওর,গণেশের হাওর, জালিয়ার হাওরের জলরাশির মাছে, খাদ্যে, পরিবেশ-প্রতিবেশ সাংস্কৃতিক ঐহিত্যে গড়ে ওঠা জনপদ, পাহাড়, বনবাদার নলখাগরায় ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল। ভূ-প্রকৃতির কোথাও হাওরের সুবিশাল জলাভূমি, কোথাও পাহাড়, কোথাও সমতল কৃষি ভূমি। এ জেলার মেঠোপথে ছড়ানো রয়েছে শত শত পুকুরের গল্প, রয়েছে জনপদ ঘেরা নদীর গল্প, হাওরের গল্প, বৃক্ষের গল্প, পাহাড়ের গল্প, নানা প্রজাতির পাখি, প্রাণীর গল্প, মাছের অভয়ারণ্য গল্প, সাদা মাটির গল্প।
পুরাতন ব্রম্ভ্রপুত্র পললগঠিত সমতল ভুমি ও হাওর অঞ্চলের বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের জীবন জীবিকা ও সম্পদ বিনিময় ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে ঠিকিয়ে রেখেছিল এঅঞ্চলের জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ২৭১টি নদ-নদী। এসব নদীর জলের পলিধারা সবুজ হয়েছে এ জনপদের প্রকৃতি,ফসলের ক্ষেত, ভরেছে কৃষকের গোলা, নদী তীরে গড়ে উঠেছে সভ্যতার চিহ্ন। নদী সাহিত্যকে উপকরণ দিয়ে সহায়তা করেছে। বহু পেশাবৈচিত্র্যর মানুষ খাদ্যে,পুষ্টিতে প্রতিপালিত হয়েছে,নদীতে চলেছে পালতোলা নৌকা,মাঝি গান গেয়ে নাইওরিকে নিয়ে গিয়েছে আপনজনের ঠিকানায়। নদীর প্রকৃতি তৈরী করেছে কবি, লেখক,গায়ক,বাউল,যার বুকে খেলা করেছে হাঁস,সাঁতার কেটেছে শিশু,যে নদীর জলে নৌকা বাইছ হয়েছে, মাছের অবাধ বিচরণ ছিলো। নদী জীববৈচিত্র্য বাঁচায়,সেচে পানি দেয়,সাহিত্যে উপকরণ দেয়। যে ব্রহ্মপুত্রের জলে জেলের জীবন ,কৃষকের সেচের পানি,জীবন সংসার, তার পায়ে আজ কেন শিকল। দখল, দূষণ,ভরাটের প্রতিযোগিতা কার স্বার্থে ? যে নদ সুন্দরের শপথ নিয়ে চলে এসেছিলো আমার আঙ্গিনায় তাকে চলতে দেয়া হলোনা আপন খেয়ালে, বিলাসে।
১৯৬৯ সালে মানুষ যখন প্রথম চাঁদে পৌছে তখন চাঁদ থেকে নভোচারীরা ব্রহ্মপুত্রের জলধারাকে দেখতে পেয়েছিলো। চন্দ্রবিজয়ের ৫৫ বছর পর এই বৃহৎ জলধারার কিনারে দাঁড়িয়ে কোন জল আমরা দেখতে পাচ্ছিনা। চীন, তিব্বত, ভারত ও বাংলাদেশের উপর দিয়ে ৩৮৪৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে গড়ে তোলেছে ৭১২০৩৫ বর্গ কিলোমিটার পানি নিষ্কাশন অববাহিকা।
ব্রহ্মপুত্র নদ তার প্রবাহ পথে তিনটি ধর্মের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধারণ করেছে। তিব্বতের সংপো অববাহিকার সম্পূর্ণ অংশ বৌদ্ধধর্ম অধ্যুষিত,আসামের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় রয়েছে হিন্দুধর্মের ব্যাপক প্রভাব। বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা অববাহিকায় রয়েছে মুসলিম ঐতিহ্যের শতশত নিদর্শন।
শুরু থেকে পতনমুখ পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদ বৈচিত্র্যময় নামে পরিচিতি লাভ করেছে। তিব্বতে ‘সাংপো,চীনা ভাষায় এর নাম ‘ইয়ারলং জাংবুজিয়াং জাংবু। চীন থেকে অরুনাচল প্রদেশে প্রবেশের পর জিহাং বা শিয়াং নামে পরিচিতি লাভ করে। আসাম রাজ্যে লোহিত বা লুইত এবং এখান থেকেই ব্রহ্মপুত্র নাম ধারণ করেছে। আসামের বোড়ো জাতিগোষ্ঠি ব্রহ্মপুত্রকে ‘বুরলং বুথুর’ নামে ডাকে। গারোদের কাছে ‘আমাওয়ারি’ ও ‘সংদি’ নামে পরিচিত। পৌরানিক নাম লৌহিত্য’ হৃদিনী বা হ্রাদিনী। ইবনে বতুতা তার লেখায় ‘ব্রহ্মপুত্রকে ‘ব্লু বিভার” এবং ইতিহাসবিদ “ব্লু জাওডি ব্যারোস” ক্যাওর নামে অভিহিত করেছেন। ব্রহ্মপুত্র নদ তার গতিপথে দুটি পর্বত প্রাচীর “গয়লাপেরি’ অপরটি ‘নামচা বারওয়া’ অতিক্রম করেছে। এসব পর্বত প্রাচীর অতিক্রমকালে অসংখ্য ছোট ছোট জলপ্রপাত তৈরী করেছে।
গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের সম্মিলিত ধারা বাংলার দক্ষিণে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ সৃষ্টি করেছে। যার আয়তন ৫৯৫৭০ বর্গকিলোমিটার। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের একাধিক মোহনা রয়েছে। যেমন ‘মেঘনা মোহনা’। ব্রহ্মপুত্র প্লাবনভূমি এলাকাটি পৃথিবীর সবচেয়ে ঘন বৃষ্ঠি¯œাত অঞ্চল। নদের প্রবাহে অসংখ্য চর রয়েছে এর মধ্যে ‘মাজলি’ নামক চর বা দ্বীপ নদী দ্বারা সৃষ্ট দ্বীপের মধ্যে বিশ্বে সর্ববৃহৎ।
ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা সবচেয়ে ভূ-কম্পন এলাকা। ১৭৬২ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত ৪৬৬ বার ভূকম্পন হয়েছে। সবচেয়ে বিধ্বংসী ভূকম্পন হয়েছে ১৭৬২, ১৭৮৫ ও ১৮৯৭ সালে। ১৮৯৭ সালের ভূ-কম্পনে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যায়। ময়মনসিংহ অঞ্চলের ৭ টি নদী বিলুপ্ত হয়ে যায়।
১৮৬৪ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের উৎসের সন্ধ্যানে অভিযাত্রীরা কৌতুহলী হয়ে ওঠে। ১৮৬৪ সালে অভিযাত্রী এডমন্ড স্মিথ,রবার্ট ডামন্ড ও টমাস ওয়বার,ভারতের দক্ষ অভিযাত্রী নয়ন সিং রাওঘাত, ১৯০৪ সালে অভিযাত্রী সিসিল রলিংস,ক্যাপ্টেইন সিএইসডি বাউটার ও লেফটেন্যান্ট এরিক বেইলি, ১৯০৬ সালে সুইডেনের সোয়েন হেডিন, ১৯৩০ সালে ভারতীয় ভৌগোলবিদ স্বামী প্রণবানন্দ ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের ড. শহীদ আলম ব্রহ্মপুত্রের উৎসের খোঁজে অভিয়ান পরিচালনা করেন। সবশেষে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্স এর সহায়তায় লিউ শাও চুয়াং নামক অভিযাত্রির কাছ থেকে।তার ভাষ্যমতে হিমালয় পর্বতমালার উত্তর দিকের অংশে অবস্থিত তিব্বতের বুরাং কাউন্টির আঙ্গসি নামক হিমবাহই হচ্ছে সাংপো বা ব্রহ্মপুত্রের আসল উৎস। শুধু চেমা থংডুং হিমবাহই এককভাবে ব্রহ্মপুত্রের উৎস নয়। বরং প্রধান উৎস হচ্ছে আঙ্গসি নামক হিমবাহ, কুবি ও চেমায়ুংডং এই তিনটি হিমবাহের অবস্থান তিব্বতের বুরাং নামক কাউন্টিতে। এখানে আছে তিনটি হ্রদ বা সরোবর। যেমন মানস সরোবর, রাক্ষসতাল ও মাপাস।
সারাবিশ্বে নদ-নদীর তালিকায় পানি নিষ্কাশনের দিক থেকে নবম এবং দৈর্ঘ্যরে হিসাবে পৃথিবীর ১৫ তম বৃহত্তম এই ব্রহ্মপুত্র নদজলধারা। ইতিহাস থেকে জানা যায় প্রায় ৫ কোটি বছর আগে টেকটোনিক প্লেটের মহাসংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হিমালয়ের কৈলাস শৃঙ্গের মানস সরোবরের আঙ্গসি হিমবাহের ৫,২১০ মিটার উচু (১৭,০৯৩ ফিট) থেকে জন্ম নেয়া ব্রহ্মপুত্র সৃষ্টি হয়ে তিব্বতের বুকে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম উপত্যকা পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। ভারতের আসাম হয়ে পরবর্তীতে বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার পাখিউড়া গ্রামের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার পাগলার চর হয়ে দক্ষিণপুর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের কাছে যমুনার সাথে মিলে পদ্মায় প্রবাহিত হয়েছে যমুনা নদী হিসেবে।
জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ, শেরপুরের নকলা শেরপুর সদর, ময়মনসিংহের ফুলপুর, ময়মনসিংহ সদর ,ত্রিশাল, গফরগাও, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া, হোসেনপুর, ভৈরব, কটিয়াদি, কুলিয়ারচর, গাজীপুর জেলার শ্রীপুর, নরসিংদীর বেলাবো অত্রিক্রম করে ভৈরব বাজারের দক্ষিণে মেঘনার সাথে মিলিত হয়েছে এবং মেঘনা নদীর সাথে মিশে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। অঞ্চলভেদে সাংপো (তিব্বত), ইয়ারলুং জাংবো (চীন), লৌহিত্য, লোহিত, দিহাং (আসাম), পুরাতন ব্রহ্মপুত্র (বাংলাদেশ) নামে পরিচিত আন্তর্জাতিক এই নদটিকে সাধারণত বাংলাদেশে এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র নামে ডাকা হয়।
ব্রহ্মপুত্র নদ তার যাত্রাকালে বেশকিছু উপনদীর জন্ম দিয়েছে। উপনদীর সংখ্যা ১৮ টি ও ১৭ টি শাখা নদী। বাংলাদেশের ভেতরে উপনদীর মধ্যে ধরলা দৈর্ঘ্য ৭৫ কিমি, তিস্তা ১১২ কিমি, মৃগী ৬২ কিমি, গিরাই ৫৬ কিমি, গঙ্গাধর, দুধকুমার, দিবাং, লৌহিত, ধানসিঁড়ি, কামেক, রায়ডাক, জলডাকা, কালজানি, তোরসা, নাগর, দুপচাপিয়া, যমুনেশ্বরী, আত্রাই নদী। শাখা নদীর মধ্যে আছে ঝিনাই দৈর্ঘ্য ১৩৩ কিমি, আইমান ৬১ কিমি, আখিলা, বানার দৈর্ঘ্য ৯৬ কিমি, সুতিয়া ৩৭ কিমি, শীতলক্ষা ১০৮ কিমি, নরসুন্দা ৫৭ কিমি, আড়িয়াল খাঁ ৬০ কিমি, ঘাগট দৈর্ঘ্য ১৯২ কিমি, বাঙালি, বড়াল, গঙ্গা, নারদ নদ, তুলসী গঙ্গা, শিব বরনাই, ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা।
এই নদের যাত্রাপথে অসংখ্য চর এবং দ্বীপের জন্ম হয়েছে। এই নদের মাজুলি দ্বীপকে পৃথিবীর বৃহত্তম নদী-দ্বীপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।উৎস থেকে চীন ও ভারতে ব্রক্ষপুত্রে মিশেছে বুঢ়হিদিহিং, দিখু, কপিলা, সুবানসিরি, কামেং, মানস, সংকোষ এর মতো জলপ্রবাহ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড পুরাতন ব্রহ্মপুত্রকে ‘নদী’ এবং ব্রহ্মপুত্রকে ‘নদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ ছাড়া উত্তর-পশ্চিম হাইড্রোলজিক্যাল অঞ্চলে যমুনা, তিস্তা ও ধরলার সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র প্রবাহের সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, জামালপুর, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎপন্ন হয়ে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে মেঘনা নদীতে মিশেছে। ২৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর অববাহিকা ৫,৪৩১ বর্গ কিলোমিটার। আইডি নম্বর : ১৭৭। ব্রহ্মপুত্রের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও জামালপুরের নদ ব্রহ্মপুত্র তিব্বতের কৈলাশটিলার মানস সরোবর থেকে উৎপন্ন হয়ে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে যমুনা নদীতে মিশেছে। ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদের অববাহিকা ২,৫৯০ বর্গ কিলোমিটার। আইডি নম্বর : ২১১। নদী খতিয়ানে যদি এরা উভয়েই ‘ব্রহ্মপুত্র’ হয় তবে রাষ্ট্রীয় দলিলে এই জলধারার একক পরিচয় এবং একক আইডি থাকাটা খুবই দরকার।
যাতাযাতের সুবিধারজন্য নদী তীরে গড়ে ওঠে নগর জনপদ। যোগাযোগের জন্য ব্রহ্মপুত্র ছিলো যেন এক তরল মহাসড়ক। নদী পথে লঞ্জ, স্টিমার দিয়ে ব্যবসা চলতো। নদী তীরে নগর, বন্দর, গ্রাম, থানার প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলে।যেমন বেপারী নৌকা দিয়ে ব্যবসা চলতো, ধানপাট,লাকড়ীর,কাঠ, বাঁশ ও মাছের ব্যবসা। নদীর তীরে গড়ে ওঠে জেলে পাড়া গুলো। সঙ্গতকারণেই জেলেদের পেশা, জীবন জীবিকার জন্য সম্পূর্ণভাবে ব্রহ্মপুত্র নদের জলের উপর নির্ভরশীল ছিলো। নদীতে মাছ ধরতো, কাডা দিতো, খরাজার, বেরজাল, ঝাকিজার, বাইড়, চুঙ্গা, বড়শী, হরগা, দিয়ে সারাবছর ধরে বংশ পরমপরায় তাদের জীবন চলতো। পুটি মাছ দিয়ে শুটকী দিয়ে অভাবের সময় বিক্রয় করে নিদান পাড়িদিতো। ব্রহ্মপুত্র ছিলো তাদের কাছে জীবিকার উৎস। জীবনযাত্রার ভরসা। পেশার ক্ষেত্র। নদী বিলুপ্তি, দখল, দূষণের ফলে জেলেরা পেশা হারিয়ে ভিন্ন পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। যে পেশায় সে বেমানান। পেশার পাশাপাশি জেলেদের মাছ ধরার উপকরণগুলো দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। নদী হারিয়ে মানুষ মাছের জন্য নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে চাষকৃত মাছের উপর।
ব্রহ্মপুত্র নদের জলে দেশীয় প্রজাতির মাছ রুই, কাতলা, বাগাইর,গুতুম, কাজলি, কালা বাউশ, কৈ চিংড়ি,গাংমাগুর, শিং, টেংরা, পাবদা, মলা, ঢেলা, চাপিলা, পাঙ্গাশ, শোল, চিতল, আইড়, ,বাইম মাছ, কাছিম, কাঁকড়া, সাপসহ নানা প্রজাতির জলজ মাছ প্রাণীর ভান্ডার ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। ময়মনসিংহের মানচিত্র থেকে প্রতিবছরই নদী,খাল,বিল,হাওর,ডুবা,খন্তা,জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান থেকে সহজেই ধারণা করা যায় যে বাংলাদেশ থেকে বহু নদী হারিয়ে গেছে। আর হারিয়ে যাওয়া সেসব নদীর সঙ্গে হারিয়ে গেছে অনেক জলজ প্রাণবৈচিত্র্য। বিলুপ্ত হয়ে গেছে নানিদ, পিলা,পানরুই, কালিবাউস, কান্দি, পাবদা,মধুপাবদা, একঠোট্টা, ঘাউরা, বাঘাআইড়, হিলং ,বাচামাছ। মাঝখানে লাভ হচ্ছে দখলদারদের ও ঠিকাদারদের।
বলা হচ্ছে যে ময়মনসিংহ এলাকায় পাওয়া যেত এমন শতাধিক মৎস্য প্রজাতি সংকটাপন্ন। এসবের মধ্যে, বালিতোরা, নান্দিনা, তিলা খোকসা, নিপাতি, দারকিনা, মাইটাভাঙা, ভোল, কাজুলি, নলুয়া চান্দা, রানী, কালবাউশ, পুটা, বাইম, কাইটা, চিতল, গজার, শোল, আইড়, গুজি,পাংগাস, চেলা, ঢেলা, কেসকি, বাতাসি, গুলসা, বালি,চাপিলা, কাজুলি,বইচা, ,তিতপুটি, কানলা, পিপলা সহ আরো অনেক নাম উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশ কৃষিবিদ্যালয়ের মৎস্য যাদুঘরে বিলুপ্ত প্রজাতির মাছের চিত্র ও মাছ ধরার উপকরণ দেখে আমাদের ভালো লাগে কিন্তু নদনদী খালবিল হাওর বিল প্রাকৃতিক যাদুঘর।
নদে বসবাসকারী সন্ধিপদ প্রাণীদের মধ্যেও কয়েকটি প্রজাতি সংকটাপন্ন বলে গবেষকরা বলছেন। নদের বড় কাইট্টা, ধুর কাছিম, কড়ি কাইট্টা,বাধিকাইট্টা, অতি বিপন্ন প্রাণী। কাছিম/কাইট্টা বিপন্ন কিংবা সংকটাপন্ন সরীসৃপ বলে জানা গেছে। জলচর স্তন্যপায়ীদের মধ্যে ভোঁদড়/উদবিড়ালের শুশুক বিপন্ন/সংকটাপন্ন বলে বলা হচ্ছে।
ব্রহ্মপুত্র নদসহ ময়মনসিংহের অনেক নদী এখন ভয়ানকভাবে বিপন্ন। তাই নদীর প্রাণবৈচিত্র্য ও এখন ভীষণভাবে সংকটাপন্ন। একসময় যেসব নদী ছিল প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ, আজ সেসব নদী পরিণত হয়েছে প্রায় প্রাণশূন্য সংকীর্ণ ¯্রােতধারায় কিংবা বিষাক্ত নর্দমায়। একসময়ের বিস্মৃত অতল জলরাশি ভরা ব্রহ্মপুত্রনদ এখন দেখা অবিস্তীর্ণ অগভীর বালিয়াড়ি ভরা এক শীর্ণকায় স্্েরাতস্বিনী হিসেবে। আবার কোনো কোনো জায়গায় নদী সম্পূর্ণভাবে মুছে গিয়ে তৈরি হয়েছে ফসলের ক্ষেত কিংবা স্থাপনা।
ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকা এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বহু হাতি, বেঙ্গল বাঘ, চিতা বাঘ,মেছোবাগ,বনবিড়াল, বন্য মহিষ, হরিণের মতো প্রাণীর সন্ধান পাওয়া যেত। এরা বেঁচে থাকার জন্য ব্রহ্মপুত্রের উপর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল ছিলো।
বাংলাদেশের প্রধান ৩০ টি কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র পলল গঠিত অঞ্চল-৯। পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল অববাহিকা হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র। প্রবাহমান জলধারা উভয় পাড়ের মাটিকে পলি ধারা করেছে উর্বর ও বৈচিত্র্যময় ফসলের আবাসভূমি। এ অঞ্চলের মাটি বিশ্বের সেরা উর্বর মাটির অন্যতম। এমাটিতে ধান, গম, ডাল, তেলজাতীয় ফসল, চা, বৈচিত্র্যময় সবজী, বাদাম,আলু, আখ, ভুট্টা, পাট, মসল্লাজাতীয় ফসল,আগর জাতীয় সবচেয়ে সুগন্ধিজাতীয় কাঠ উৎপাদন হয় ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায়। গ্রামের মানুষ তার কৃষি কাজের জন্য, গোসলের জন্য, গরুর গোসলের জন্য সবজী ও ধান ক্ষেতে সেচের জন্য নদের জল ব্যবহার করেছে। গ্রামের কৃষকের শত শত পাওয়ার পাম্প বসতো নদের জলে যে পানি দিয়ে রোরো মৌসুমের পুরো সেচের কাজ চলতো। বর্তমানে পানি না থাকার কারনে হাজার হাজার কৃষক ভুগর্ভের পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে এলাকার ভু-গর্ভের পানির উপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ছে আয়রণ ও আর্সেনিক। পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু এখন আর ব্রহ্মপুত্রে পানি নেই। ¯্রােত নেই। কৃষকের কৃষি খরচ বেড়ে গিয়েছে। পানি এখন কিনে আনতে হয় পয়সা খরচ করে। বিদ্যুতের লাইন সংযোগ না পেলে অনেক ফসলি জমি পতিত থেকে যায়। খাদ্য উৎপাদনও কমে যায়।
আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, ভারত ও তিব্বতে কিংবা বাংলাদেশের বাস্তুতন্ত্রে ও সমাজে ব্রহ্মপুত্রের সংকট এক রকম নয়। আজ যখন বাংলাদেশে শীর্ণ-ক্ষীণ-বিক্ষত হয়ে আছে ব্রহ্মপুত্র, আবার যখন চীন ও ভারতে বৃহৎ বাঁধ নির্মাণ করে নদের জলকে ব্যবহার করছে কৃষি সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
ব্রহ্মপুত্র যেন এক সাংস্কৃতিক বলয়। নদের সাথে আমাদের সংস্কৃতি বিশেষভাবে জড়িত। ছোট কবিতা, ছড়া, সনেট, কাব্য, গল্প, নাটক, উপন্যাস, গান, চলচ্চিত্র সকল কিছুতেই নদ-নদীকে কেন্দ্র করে হয়েছে, রসদ যোগিয়েছে। ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষকে দিনেদিনে কবি, বাউল, লেখক,গবেষক ,গায়ক ভাবুক করে তুলেছে এ অঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থা। ময়মনসিংহ গীতিকার অনেক গল্প, কাহিনী, শ্লোক, ছড়া, নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। নদী যত বিলুপ্ত হচ্ছে, মানুষ ততই দিনদিন প্রকৃতি থেকে সড়ে যাচ্ছে। প্রকৃতি থেকে যত সড়ে যাবে তত বেশী মানুষ সংস্কৃতিহীন, বিপন্ন হয়ে উঠবে। নদী হচ্ছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। পৃথিবীতে প্রধানত ৯টি নদী টাইগ্রিস, ইউফ্রেটিস (মেসোপটেমিয়া সভ্যতা), নিল নদ (মিসরীয় সভ্যতা), সিন্ধু (সিন্ধু সভ্যতা), হোয়াংহো, ইয়াংসি (চৈনিক সভ্যতা), ভলগা (রুশ সভ্যতা), সরস্বতী (হরপ্পা সভ্যতা) ও গঙ্গাকে (বৈদিক সভ্যতা) কেন্দ্র করে পৃথিবীর সাতটি অঞ্চলে বিভিন্ন সময় বিকশিত হয়েছিল সভ্যতা। মানুষকে তাদের যাযাবর জীবন ছেড়ে কৃষি জীবনে প্রবেশের জন্য মূল হাতছানি দিয়েছিল নদী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শক্তি, শিল্প, মৎস্য, নগরায়ণ ইত্যাদি বিষয় বিকশিত হয়েছিল নদীর মাধ্যমেই।পৃথিবীর প্রায় সব দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নদীর প্রবল উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য নদী হচ্ছে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান, বাস্তুতন্ত্রের জীবনরক্ত। প্রাণবৈচিত্র্যের নিরাপদ আধার। জলবায়ুর অন্যতম নিয়ন্ত্রক। প্রাকৃতিক ছাঁকনি। কার্বনের আধারও। নদী হচ্ছে পরিবাহক বেল্ট, যা মহাদেশ থেকে সমুদ্রে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং অন্যান্য দ্রব্য সংগ্রহ ও পরিবহন করে। ভূগর্ভস্থ পানির অন্যতম জোগানদাতা হচ্ছে নদী। খরা ও বন্যার প্রশমনদাতাও। পানি ও পলল পরিবহন প্রক্রিয়ায় গড়ে নেয় তারা তাদের নিজস্ব আকৃতি।
পৃথিবী নামক গ্রহটির জন্য নদী হচ্ছে জীবনরেখা। কিন্তু সেই জীবনরেখা এখন বিপদাপন্ন। নদ-নদীর ইতিহাস, নদ-নদীর ঐতিহ্য, নদীর সাংস্কৃতিক অলংকার ময়মনসিংহের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদীসমূহ এদেশের ঐতিহ্য ও অহংকারের সচল ধারা। জলাভূমিসমূহ লোকগাথা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আঞ্চলিকতা ছাপিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বিকশিত করেছে ঐতিহ্যকে। নদীর অবস্থান, আচরণ, বিস্তৃতি প্রতাগত ঐতিহ্য তাই এদেশকে শুধু নদীমাতৃক দেশে রুপান্তরিত করেনি, দিয়েছে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে সমৃদ্ধি।
আমাদের চিন্তার বিষয় হলো এশিয়ান ওয়াটার টাওয়ার, এশিয়ার প্রধান নদনদী এশিয়ান ওয়াটার তিব্বতের মালভূমি। এই তিব্বত থেকে উৎপত্তি হয়েছে ব্রহ্মপুত্র,গঙ্গা, সিন্ধু, কার্নালি, কোশি, সালুইন, ইরাবতী, মেকঙ, ইয়াঙসি, ইয়োলো মতো এশিয়ার বড় নদী। বাংলাদেশ পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ভূটান, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম এর প্রায় ২০০ কোটি মানুষ তার জীবন জীবিকার জন্য সরাসরি নির্ভরশীল নদীর উপর।কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তিববতের মালভূমিতে যখন দুর্যোগের অভিঘাত লাগে তার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। কারণ ব্রহ্মপুত্রসহ আন্তসীমান্ত নদনদীর মাধ্যমে ভাটির দেশে চলে আসে পানি, শুরু হয় বন্যা,পাহাড় ধ্বস, ক্ষতিগ্রস্থ হয় পরিবেশ, কৃষি, জীবন জীবিকা। নদী প্রণালি হলো এই অভিঘাত আসার রাস্তা।
নদী রক্ষা কমিশন ২০২০ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের নদ-নদীর দখলদারদের সর্বশেষ তালিকাটিতে ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের দখলদারের তালিকাতে দেখা যায় ময়মনসিংহ শহরে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন, মেয়র ও তাঁর পরিবার,আওয়ামীলীগের কার্যালয়, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সরকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ময়মনসিংহ জেলায় নদনদী ও খালদখলের তালিকায় ১৩ উপজেলায় ২১৬০টি দখল আছে। সদর উপজেলাতেই ১৫০৪ টি ও নান্দাইল উপজেলায় ৩৪২ টি। সিটি কর্পোরেশন,ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শিল্পকারখানার বেশ্ভীাগ বর্জ্য এই নদে ফেলা হয়। কিশোরগঞ্জের কটিয়াটিতে ব্রহ্মপুত্র দখল করে পুকুর করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। পুকুর পাড়ে করা হয়েছে আম বাগান। এভাবেই ব্রহ্মপুত্রের দুইতীর দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে প্রতিষ্ঠান, অফিস, বাসাবাড়ি, গাড়ীর গ্যারেজ, বাসষ্ট্যান্ড। চলছে খনন , চলছে বালু ব্যবসা। ব্রহ্মপুত্র এখন লোভ ও লাভের জায়গা।
ব্রহ্মপুত্র নদ ১৯৮৮ সালে খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ খনন হলে নাব্যতা ফিরে আসবে। ২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজ মাঠে এক নির্বাচনী জনসভায় ব্রহ্মপুত্র খননের কথা বলেছিলেন। ২০০৯ সালে ময়মনসিংহের নাগরিক সমাজ নৌপরিবহনমন্ত্রীর সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র খনন নিয়ে মতবিনিময় করেন। ২০১০ সালে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ দল ব্রহ্মপুত্র পরিদর্শন করে। পরে ২০১৯ সালে নদের নাব্যতা,যাত্রীবাহি পণ্যবুঝাই চলাচলা কৃষিজমি মৎস্য সম্পদ উন্নয়নের লক্ষ নিয়ে ফুলছড়ি উপজেলার পাগলার চর যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের সংযোগ স্থল থেকে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার টোক পর্যন্ত ২২৭ কিমি এলাকা ড্রেজিং করার জন্য চার বছর মেয়াদি ২৭৬৩ কোটি টাকার ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ড্রেজিং প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহন করা হয়। ২০২৪ সালে প্রকল্পটি শেষ হবে। কিন্তু অপরিকল্পিত অকার্যকর এই প্রকল্প কোন কাজেই আসছেনা। যেখানেই খনন করা হচ্ছে সেখানেই চর জাগছে, নদটি একটি সরু খালে পরিণত হচ্ছে। মাঝখানে লাভবান হচ্ছে ঠিকাদার ও বালু ব্যবসায়ীরা।
নদনদীকে বাঁচাতে হলে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। জরিপ করে নদনদীর সীমানা নিধারণ করতে হবে, পরিবেশ নীতির বাস্তবায়ন, দূষণ হ্রাসকরণ, নদনদী, উৎসমুখ,শাখা নদী,উপনদী,সংযোগ খাল খনন করতে হবে, অপরিকল্পিত বাঁধ,সেতু নির্মান করা যাবেনা, জনসচেতনতা তৈরীকরা, নদীদখলকারীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না দেয়া,ব্যাংক ঋণ না দেয়া বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
জলধারা হারিয়ে যাওয়া মানে একটি জনপদ বিপন্ন হয়ে যায়, নদী হারিয়ে যায় প্রকৃতির সৌন্দর্য্য হারিয়ে যায়। ব্রহ্মপুত্র তীরে হেটে আমরা বুকভরা নির্মল বাতাস গ্রহন করেছি। নৌকায় চড়ে নতুন বিয়ে করে জামাই শ্বশুর বাড়ি গিয়েছে,বৌ আনন্দে নাইওর করেছে। নদীর জলে অবাধ সাঁতার কেটেছে বালক বালিকা, নারীপুরুষ সকলে মাছ ধরেছে জাল দিয়ে বর্শি দিয়ে, নৌকা ভ্রমন করেছে সাথীরা মিলে। ব্রহ্মপুত্র বিলুপ্তির কারণে পানির জন্য আজ হাহাকার, ভূপগর্ভের পানি আজ অনেক নিচে নেমে গেছে। নদীর জলে এখন আর গোসল করতে পারেনা। নদীর দখল দূষণ আমাদেরকে শুধুই আহত করে। ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে ধু ধু বালুচর,পাড়ে আজ ময়লার স্তুপ,পানিতে ময়লা ,পাড়েময়লা।
সভ্যতা আমাদের সঠিক মাত্রায় সভ্য করেনি। যেমন শিক্ষা আমাদের শিক্ষিত করেনি। পরিবেশ ভাবনা আমাদের ভাবিত করেনি। সংকটের আবর্তে বাস করেও আমরা নিজেদের শংকিত মনে করিনা। উদাসীনতা আমাদের বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করছে। বিবেক আছে, তাড়না নেই। মন আছে মননশীলতা নেই।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জনাব সাদেকুর রহমান পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানির গুণগত মান নিয়ে ২০১৯ সালে একগবেষণায় তিনি জানিয়েছিলেন এ পানিতে জলজপ্রাণী বাঁচতে পারবেনা। মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য।
ব্রহ্মপুত্র আমাদের অস্তিত্বের অংশ, আমাদের নান্দনিকতার উৎস। নদকে হত্যা করে আমরা সভ্যতা ও সংস্কৃতির সচল ধারাকে অবলুপ্ত করতে চাই না। নদী সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রধানতম ধারক ও বাহক। জীবনের বাঁক ও বোধগুলোকে নদনদীর নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের সাথে মিলিয়ে জীবনকে জীবনসম্পৃক্ত রাখতে হবে। জীবনের দুঃখ বেদনা, ভাঙাগড়ার মতো নদীর ভাঙা গড়া ও নিরবচ্ছিন্নতাকে জীবনের পরিবর্তনশীল প্রত্যয়ের অনুষঙ্গ করে নদী ও জীবনকে একাকার করে দেখাই আমাদের প্রতিশ্রুতি হওয়া দরকার। আসুন, আমরা নিজেকে নিঃশর্তভাবে নদীর কাছে নিয়ে যাই। নদীকে নদীর মতো করে, নদী ভেবে নদীর কাছে ফিরিয়ে দিই।
নদী হারিয়ে যায় মানে কৃষি হারিয় যায়, সংস্কৃতি হারিয়ে যায়,ভাষা হারিয়ে যায়,নদী হারিয় যাওয়া মানে একটি জনপদ বিপন্ন হয়ে উঠে। সত্তর বছর আগে লেখক সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ নামে যে কালজয়ী উপন্যাস রচনা করেছিলেন তার মধ্যে তিনি বলেছিলেন নদী মরে যাওয়ার ফলে একটি জনপদের মানুষের ,শিক্ষার্থীর,পেশার,জীবনযাত্রার কি যে বিপন্নতা তৈরী হয়েছিল তা তিনি তুলে ধরেছিলেন। তিনি যেমন নিশুতি রাতে নদীর কান্না শুনতে পেয়েছিলেন জনপদের মানুষও মৃত নদীর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলেন।নদী বিপন্ন মানে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন,কৃষিভিত্তিক সমাজ ধ্বংস,পেশা বিপন্ন,দুহাত বাড়িয়ে দুর্ভিক্ষ ডেকে আনা,বাংলাদেশে নদী বিপন্ন মানে ভবিষৎ প্রজন্মের জীবনযাপন অনিশ্চিত করে দেয়া।
ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় ঠিকে থাকার জন্য নদের অস্তিত্ব চাই, স্বাভাবিক প্রবাহ চাই,নদ কেড়ে নিক আমার বসতভীটা,আমার গোয়ালের গরু,ফসলের জমিন,গোলার ধান, সেটা নদ-নদীরই অধিকার। নদী এপার ভেঙ্গে অপার গড়েছে, পলি জমিয়েছে আমার ফসলি জমিতে,চর জাগিয়েছে,অপারে নতুন বসতি গড়ে তুলেছি। আমাদেরই গড়ে হবে তুলতে ব্রহ্মপুত্র বাঁচানোর আন্দোলন। ব্রহ্মপুত্র বাঁচলে এই জনপদ বাঁচবে, বাঁচবে প্রকৃতি।
মো.অহিদুর রহমান, লেখক ও গবেষক


























