বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম, প্রকাশক , জনতারআদালত.কম । ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ।
মাননীয় তথ্যমন্ত্রীর কাছে জাতি জানতে চায়-জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদের প্রতি এতো অবহেলা ও অবজ্ঞার রহস্য কী ?

টেলিভিশনের পর্দায় “বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া” -এর প্রথম টেস্ট ম্যাচের খেলা দেখছিলাম। খুবই টেনশনে ছিলাম। যদি বাংলার দামাল ছেলেরা হেরে যায়, তো আজ রাতে আমার ঘুম হবে না। তাই, বাসার সবাইকে সাথে নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ছিলাম। টেনশন বাড়ছিলো, এই বুঝি হেরে যায় বাংলাদেশ! যখন অস্ট্রেলিয়ার মাত্র ২১ রান দরকার, তখন বাংলার মানুষ খুবই উদ্বিগ্ন ছিলো।
মানসিক চাপ বেড়ে খুবই প্রখর তখন। ঠিক সে সময় স্টেডিয়ামে দর্শকসারীতে এসে উপস্থিত হলেন বাংলার মানুষকে সকল আপদ-বিপদ থেকে উদ্ধারের মহানদাত্রী ১৬কোটি মানুষের শেষ ঠিকানা বঙ্গবন্ধুকন্যা- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁকে দেখে বাংলার মানুষের মন থেকে সকল সংশয়-উদ্বিগ্নতা দূর হয়ে গেলো। কারণ, মানুষ বুঝতে পেরেছিলো, বাংলার মুক্তিদাত্রী যখন স্টেডিয়ামে এসেছেন –বাংলার টাইগাররা অবশ্যই জয়লাভ করবে। হলোও তাই !

২০ রান হাতে থাকতেই অজিদের শেষ উইকেটটি আউট হয়ে গেলো। সাথে-সাথে সারা এলাকায় মানুষের উল্লাস ধ্বনি, আনন্দ-ফুর্তি, রং খেলা চললো। হঠাৎ টিভি স্ক্রিনে ভেসে উঠলো- “বাংলার বাঘের কাছে ক্যাঙ্গারু ধরাশায়ী” এবং সাথেসাথে বরাবরের মতো নিউজবার গুলোতে আসতে থাকলো… মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব আঃ হামিদ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পীকার, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী এবং বি.এন.পি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার অভিনন্দন বার্তা।
এখানে উল্লেখ্য যে, আমার এই লেখাটির প্রসঙ্গঃ- কোনো কোনো টিভি চ্যানেলে দেখেছি- “মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বি.এন.পি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার অভিনন্দন বার্তা” -শিরোনামে লেখাগুলো যাচ্ছিলো। জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী- বেগম রওশন এরশাদের নামই নেই ! কিন্তু কেনো ?

জাতির পক্ষ থেকে মাননীয় তথ্যমন্ত্রী মহোদয়ের কাছে সবিনয়ে জানতে চাই, বেগম রওশন এরশাদের নাম বাদ যায় কিভাবে? দেশে সংসদীয় সরকার বিদ্যমান। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আঃ হামিদ, সংসদনেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ ও সংসদের মাননীয় স্পীকার ডঃ শিরীন শারমিন এবং তারপর অন্যান্য সংগঠনের নেতানেত্রীর নাম আসতে পারে।
নির্বাচন কমিশনার ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর। নির্বাচন কমিশনার সকল দলকেই আহ্বান করেছিলেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য। গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগসহ ১৪দল নির্বাচনে অংশ নেয়। বি.এন.পি-জামাত অশুভশক্তির ইঙ্গিতে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ক্ষমতায় আসতে চেয়েছিলো বলেই তারা নির্বাচন বয়কট করেছিলো। কিন্তু, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী আরেক নেত্রী জাতীয়পার্টির চেয়ারম্যান এইচ.এম. এরশাদের কথা অমান্য করে গণতন্ত্র কায়েমের স্বার্থে বেগম রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয়পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তী মুহূর্তে এইচ.এম. এরশাদ সাহেবও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে রাজি হয়েছিলেন।

যদি রওশন এরশাদ গত নির্বাচনে তাঁর জাতীয়পার্টি নিয়ে অংশগ্রহণ না করতেন, তবে আজকে দেশের কী অবস্থা হতো! এইচ.এম. এরশাদ সাহেব তো নির্বাচনে যেতে রাজিই ছিলেন না, আপনি তা ভালো করেই জানেন। একমাত্র রওশন এরশাদ আওয়ামীলীগ সভানেত্রী জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন যে, “দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে আমি যেভাবেই হোক নির্বাচনে যাবো। যেনো, দেশে সামরিক শাসন আর না আসতে পারে। খালেদা জিয়া রাজনীতির পানি ঘোলা করে কোনোভাবেই যেনো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি- জামাতকে নিয়ে যেনতেনভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় না আসতে পারে।”

বহিঃশত্রুর ষড়যন্ত্রে এদেশীয় দালাল জামাত-বি.এন.পি জোট নির্বাচনে না এসে মানুষ মারা আরম্ভ করলো। রেললাইন তুলে ফেললো। রেলের বগি পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করতে লাগলো। বাস ও সি.এন.জি অটোরিক্সায় আগুন জ্বালিয়ে অনেক প্রাণ নির্বিচারে নিয়ে নিলো বি.এন.পি-জামাতের নেতাকর্মীরা। আজ তারা সাধু সেজেছে। গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না করছে। কি করে তারা গণতন্ত্র চায়? তারাই তো গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে!

তারা নির্বাচনে আসবে না, নির্বাচন করবে না। আর দোষ দিবে অন্যদের।
আসলে, এটাই তাদের স্বভাব। এটাই তাদের রাজনীতি।

যাই হোক, কিছুক্ষণ পর টিভিতে আরও দেখলাম- আমাদের প্রিয় স্বাধীনবাংলা বেতারের কণ্ঠশিল্পী আঃ জব্বার ভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি র’জিউন)
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জব্বার ভাইয়ের কণ্ঠে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের দেশাত্মবোধক গান শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা পাকবাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়তাম। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তাঁর অবদান অনেক।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব খুব স্নেহ করতেন জব্বার ভাইকে। জব্বার ভাইয়ের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিলো বেশ মধুর। প্রায়ই আমরা একসাথে আড্ডা দিতাম।
আল্লাহ্ তা’আলা তাঁকে বেহেস্তবাসী করুন, এই দোয়াই করি।
এখানেও ঐ একই দৃশ্য। জব্বার ভাইয়ের মৃত্যুতে শোকবার্তার তালিকায় পূর্বের মতোই খেলা চলছে। বেশকিছু শিরোনামেই মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের নাম নেই। অথচ, লন্ডনে অবস্থানরত গণতন্ত্র ধ্বংসে লিপ্ত আগুন-সন্ত্রাসী খালেদা জিয়ার শোকবার্তা বরাবরের মতোই রয়েছে। ঐ চ্যানেলগুলি কি ইচ্ছাকৃতভাবে এগুলি করছে না ? সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করে, এ কাজগুলো ঐসব টিভি চ্যানেলগুলি ইচ্ছাকৃতভাবেই করে যাচ্ছে।
মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়, কেউ জানুক আর না-ই বা জানুক, আপনি তো ভালো করে জানেন- রওশন এরশাদ যদি নির্বাচনে না আসতেন, তবে বর্তমানে দেশে গণতন্ত্র থাকতো কি-না সন্দেহ। তবে থাকতো, বি.এন.পি-জামাতের “আগুন-সন্ত্রাস ও মানুষ মারার” গণতন্ত্র !

বি.এন.পি-জামাত চেয়েছিলো কেউ নির্বাচনে আসবে না, নির্বাচনও হবেনা। আর, তারাই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে ক্ষমতায় আসতে পারবে।

কিন্তু, বেগম রওশন এরশাদ নির্বাচনে এসে তাদের বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে দিলো। দেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন হলো। বি.এন.পি প্রবলভাবে নির্বাচনে বাধা দিয়েছিলো। নির্বাচনকেন্দ্র পুড়িয়ে দিয়েছিলো, থানা লুটপাট করেছিলো, এমনকি পুলিশ-বিজিবির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হত্যাও করেছে।

মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছে। এমন অনেক ধ্বংসাত্মক কাজ করেও নির্বাচন হওয়া ঠেকাতে পারেনি। রওশন এরশাদের নৈতিক সমর্থনের কারণেই আওয়ামীলীগ নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে ও সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।

তাই তো আজ দেশে এতো উন্নয়ন। সারাবিশ্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল-মডেল। মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করছে। বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা ছাড়াই নিজস্ব অর্থে মানুষের প্রাণের দাবি “পদ্মাসেতু” বাস্তবায়নের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে।

জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় আপনার মন্ত্রণালয় ৪০ থেকে ৪২টি টিভি চ্যানেল ও অনেকগুলো বেতারকেন্দ্র চালু করে দেশের কর্মসংস্থানের প্রসার ঘটিয়েছেন। এগুলো সবই কিন্তু নির্বাচিত সংসদীয় সরকার ও প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতের স্পর্শেই সম্ভব হয়েছে।
মাননীয় তথ্যমন্ত্রী মহোদয়, আপনার ভাষায় বর্ণিত “আগুন-সন্ত্রাসের নেত্রী” খালেদা জিয়াকে সম্মান দেখাচ্ছে আপনারই অনুমোদন দেওয়া কতিপয় মিডিয়া।

গণতন্ত্রের পুরোধা, বর্তমান গণতন্ত্রের চালিকাশক্তি- সাংবিধানিক সরকারের মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদের প্রতি যেনো আর কোনোরূপ অবহেলা-অবজ্ঞা প্রদর্শন করা না হয়, এটাই কামনা করি। তাঁর প্রতি এই অবহেলা-অনীহা সৃষ্টি কিভাবে হয়েছে, কি কারণে হয়েছে, কারা করছে –তার রহস্য অবশ্যই জাতির কাছে উন্মোচন করবেন, এটাই জাতির প্রত্যাশা।


























