প্লাস্টিক বনাম পৃথিবী। প্লাস্টিক না থামালে দূষণ দুর্যোগে পড়বে পৃথিবীর মানুষ।
ধরিত্রী দিবসের প্রতিপাদ্য: প্লাস্টিক বনাম পৃথিবী। জাতীয় সংসদে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মাননীয় সাংসদ ব্যারিস্টার সুনম ও ফেরদৌস হাসান প্লাসিকের ভয়াবহতার কথা জোর দিয়ে উত্থাপন করেছেন। সরকার , উৎপাদক,ব্যবহারকারী সকলের সচেতনতা ও ধারাবাহিক সামাজিক আন্দোলনের মধ্যদিয়েই প্লাস্টিক আগ্রাসন রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। উৎপাদন থেকে দোকান, দোকান থেকে পরিবেশে, পরিবেশ থেকে মানবদেহে, সভ্যতার নীরব ও সরব ঘাতক এই পাস্টিক। কোথায় নেই প্লাসিক। সাগর, নদীতে, হিমালয়ের চূড়া, ধানের জমি, মাটি, খাদ্যের মোড়কে, ফ্রিজে, মানুষের রক্তে, মায়ের দুধে, খাবার টেবিলে,সমুদ্র সৈকতে,ড্রেনে সব স্থানে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ,মিশে আছে মরণ কণা প্লাস্টিক। আমরা জানি এর দূষণ ভয়াবহতা,জেনেও ব্যবহার করছি। দেখেও না দেখার ভান করছি আমরা। কর্ণফুলি ও বুড়িগঙ্গার তলদেশ থেকে প্লাস্টিকের বজ্র অপসারণের দৃশ্য আমরা দেখেছি কিছুদিন আগে। কি ভয়াবহ পরিস্থিতি নদীর তলদেশ। যার শিকার আমরা মানবজাতি। সমুদ্র সৈকতে যেসব ডলফিন মারা গেছে তাদের পেটে প্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
প্লাস্টিক ক্ষুদ্র কণা হয়ে ঢূকছে মানব দেহে। প্লাস্টিক দূষণের আরেকটি ভয়াবহ রূপ মাইক্রো প্লাস্টিক। মাইক্রো প্লাস্টিক হচ্ছে প্লাস্টিক ক্ষুদ্রতম কণা। সম্প্রতি চাঞ্চল্যকর এক গবেষণায় উঠেছে যে, বাচ্চা থেকে প্রবীণ, দুধের ফিডিং বোতল থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের পানি খাওয়ার বোতল , বাজারের ব্যাগ সবই মহাবিপদ। দিনভর ব্যবহৃত প্লাসিকের সরঞ্জাম থেকেই মানবদেহে বাসা বাধছে মাইক্রো প্লাস্টিক । বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ০.২ ইঞ্চি বা ৫ মিলিমিটার ব্যাস যুক্ত প্লাস্টিক কণার তুলনায় ছোট কণাকে মাইক্রো প্লাস্টিক বলে। যা অজান্তেই মানুষের শরীরকে বিষক্রিয়ায় ভরিয়ে তুলছে। যার ফল হচ্ছে ভয়াবহ। এমনই দাবি করলেন সুদূর নেদারল্যান্ডের একদল গবেষক।
আলোচনার টেবিলে আমরা সবাই সচেতন। কিন্তু ব্যবহারের দিক দিয়ে সবাই ব্যবহার করছি। পলিথিন নিষিদ্ধ জেলা, উপজেলা,বিভাগ ঘোষণা করে লাভ কি হচেছ। কোন অভিয়ান পরিচালনা করা হচেছনা। আমরা করোনার জন্য যেভাবে প্রচার অভিয়ান পরিচালনা করেছিলাম ঠিক সেভাবেই প্রচার,আন্দোলন শুরু করতে হবে। তা নাহলে ভয়াবহ দিন সামনে অপেক্ষা করছে আমাদের সামনে।
নেদারল্যান্ডের গবেষকের দাবি, সারাদিন ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বিভিন্ন উপকরণ থেকে মানুষের রক্তে মিশে যাচ্ছে মাইক্রো প্লাস্টিক। যে প্লাস্টিক মানুষের শরীরে তৈরী করে ক্যান্সারসহ নানা মারাতœক রোগ। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন মানুষের রক্ত পরীক্ষা করে রক্তের মধ্যে মাইক্রো প্লাস্টিকের সন্ধান পেয়েছেন ওই বিজ্ঞানীরা। তাদের দাবি, বর্তমানে দিনের শুরু থেকে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত গোটা পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ প্লাস্টিকের বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করেন। তার থেকেই ছোট কণা মানুষের শরীরে রক্তে মিশে যাচ্ছে। তবে শুধু মাইক্রো প্লাস্টিকই নয়, অপেক্ষাকৃত বড় কণাগুলোও বর্তমানে গোটা পৃথিবীজুড়ে দূষণের অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। মানুষের নিত্য প্রয়োজনে ব্যবহৃত খাদ্য, পানীয় এবং ফুসফুসেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, গবেষণা চলাকালীন শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মলে মাইক্রো প্লাস্টিকের সন্ধান মিলেছে।
মাইক্রো প্লাস্টিকের উৎস আমাদের নিত ্যব্যবহার্য জিনিস। সকালের টুথপেস্ট থেকে শুরু করে ফেসওয়াশ, বডিওয়াশ, নেইলপলিশ ইত্যাদি প্রসাধনী, এমনকি ডিটারজেন্ট পাউডারেও রয়েছে মাইক্রো প্লাস্টিক। সমুদ্রে ভাসমান প্লাস্টিক বর্জ্য সূর্য্যরে অতিবেগুনি রশ্মির সহায়তায় ভেঙে মাইক্রো প্লাস্টিকে পরিণত হয় এবং খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে চলে আসে মানব শরীরে। খাদ্যের সঙ্গে সেসব মাইক্রো প্লাস্টিক চলে যাচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণীদের শরীরে।
বাজারে নামকরা ব্র্যান্ড ও খোলা লবণে আণুবীক্ষণিক প্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন একদল গবেষক। ব্র্যান্ডের লবণের তুলনায় খোলা লবণে প্লাস্টিকের মাত্রা বেশি মিলেছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শফি মুহাম্মদ তারেক, সহযোগী অধ্যাপক ড. ফাহমিদা পারভিন এবং একই বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী জয়শ্রী নাথ ও তামান্না হোসেন। গবেষণায় দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগর থেকে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করা খাবার লবণে পলিস্টেরিন, ইথিলিন-ভিনাইল অ্যাসিটেট, পলিথিলিন, নাইলন, পলিথিলিন টেরেপথ্যালেট পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা একটি যৌথ গবেষণা চালান। গবেষণার শিরোনামটা ছিল ‘বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক মাছ ও অন্যান্য প্রজাতির ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ’। চলমান এ গবেষণায় জানা যায়, বঙ্গোপসাগর থেকে আহরিত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও অণুজীবের পেটে ক্ষুদ্র আকারের প্লাস্টিক বা মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত আন্ত:সীমান্ত নদী দিয়ে এবং চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান থেকেও প্লাস্টিক বর্জ্য এসে পড়ছে আমাদের বঙ্গোপসাগরে।
বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অন্যতম একটি উৎস সম্ভবত ফসলি জমিতে ব্যবহৃত সার। এসব সার শুকিয়ে গেলে তাতে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক বাতাসে মিশে যায় বলে বিজ্ঞানীদের দাবি। এমনকি সিনথেটিক কার্পেট ও কাপড় থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।এভাবেই প্রতিনিয়ত পরিবেশের প্রতিটি উপাদানের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে মাইক্রোপ্øাস্টিক, যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রাণীজগতের ওপর। এর ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক প্রাণবৈচিত্র্য।
আমাদের সচেতনতার অভাবে যাচ্ছে তাই ভাবে প্লাস্টিক ব্যবহার করছি। চারপাশ প্লাস্টিকের বর্জ্যে সয়লাব। প্লাস্টিক ব্যবহার ও এর বর্জ্য দেশের পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। ২০২১ সালে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত ১৫ বছরে দেশের নগরগুলোতে এর ব্যবহার তিনগুণ বেড়েছে। ২০০৫ সালে ঢাকার বাইরে অন্যান্য নগরে মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার ছিল ৩ কেজি, ২০২০ সালে সেটি হয়েছে ৯ কেজি। ঢাকা শহরে ৯ কেজি থেকে বেড়ে প্রায় ২৩ কেজি হয়েছে। দেশে সারাবছর যে পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়, তার ১০ শতাংশ প্লাস্টিকের পণ্য থেকে আসে। এর ৪৮ শতাংশ মাটিতে পড়ে, ৩৭ শতাংশ পুনরায় ব্যবহৃত হয়। ১২ শতাংশ পড়ে খাল ও নদীতে, ৩ শতাংশ নালাতে গিয়ে মেশে। মাটিতে পড়া প্লাস্টিকের বড় অংশ পলিথিন ব্যাগ, পণ্যের মোড়ক ও প্যাকেট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য। পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ার পরও শুধু রাজধানীতেই প্লাস্টিক বর্জ্য বেড়েছে তিন গুণের বেশি, নগরবাসীর অসচেতনতার কারণে প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পথে এগোচ্ছে। সরকার পলিথিনের পরিবর্তে পাটের ব্যাগ ব্যবহারের কথা বললেও, দেশের পাটকলগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ পাটের ব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহ হারাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধুমাত্র প্লাস্টিক দূষণের কারণে প্রতি বছর প্রায ১০০ মিলিয়ন সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণ মারা যাচ্ছে। পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকে আছে সামুদ্রিক সিস্টেমের কারণে। খাদ্য ও অক্সিজেন সরবরাহের মাধ্যমে সমুদ্র পৃথিবীর প্রাণীকুলের অস্তিত্ব রক্ষা করে। আমাদের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে সামুদ্রিক পরিবেশ বিপন্ন হতে চলেছে। পরিবেশ দূষণের এই দায়ভার আমাদেরকেই বহন করতে হবে।
আইন করে ২০০২ সালে প্লাস্টিক জাতীয় পলিথিন উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। আইনে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি নিষিদ্ধ পলিথিন সামগ্রী উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাত করে তাহলে ১০ বছরের কারাদ- বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা এমনকি উভয় দ- হতে পারে।
সরকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০২১ প্রণয়ন করেছে। এ বিধিমালা বিধি ৮(৩)-এ বর্জ্য নিক্ষেপের জন্য প্লাস্টিকজাত ব্যাগের ব্যবহার রোধ করা এবং জৈব পচনশীল ব্যাগ বা মোড়ক ব্যবহারে অগ্রাধিকার করাকে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বিধি ৯(১)-এর বিধান অনুযায়ী পণ্য প্রস্তুতকারক বা আমদানিকারকের দায়িত্ব হচ্ছে উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ঊচজ)-এর আওতায় জৈবিকভাবে অপচনশীল ডিসপোজেবল পণ্যের প্রস্তুতকারী বা আমদানিকারকরা টিন, প্লাস্টিক, সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক, পলিথিন, মালটি লেয়ার প্যাকেজিং বা মোড়ক, বোতল, ক্যান বা সমজাতীয় পণ্যের মাধ্যমে সৃষ্ট বর্জ্য গ্রাহক পর্যায় হতে সংগ্রহ করে, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, পুনঃ চক্রায়ণসহ করা। প্লাস্টিক বর্জ্য চিরতরে নির্মূল করতে একটি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক আইন তৈরি করতে গত ২ মার্চ, ২০২২ নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ পরিবেশ পরিষদের সমাবেশ শেষে একটি রেজ্যুলেশন গ্রহণ করেন বিশ্বের ১৭৫টি রাষ্ট্রের নেতা, মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা। আইন ফাইল বন্দি থাইলেই হবেনা। প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামতে হবে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে বাঁচাতে।
ক্ষতিকারক জেনেও মানুষের মধ্যে দিনদিন পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহার এবং অব্যবস্থাপনার হার ক্রমেই বাড়ছে। দামে সস্তা ও ব্যবহারে সহজলভ্যতার কারণে পলিথিন ব্যবহার কমছে না। এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি। পলিথিনের বিকল্প পাট বা পচনশীল ব্যাগ ব্যবহার বাড়াতে হবে। প্লাস্টিক বর্জ্যের দূষণ ঠেকাতে পলিথিনের বিকল্প ব্যবহার এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক রিসাইক্লিং করা অপরিহার্য। একইসাথে বিপন্ন পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় মানুষের মধ্যে সচেতনতাও জরুরি। তা না হলে এই পৃথিবীতে শুধু প্লাস্টিক থাকবে , মানুষ থাকবেনা।
মো. অহিদুর রহমান
পরিবেশ কর্মী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ,বারসিক।


























