নেত্রকোনা জেলার সীমান্তের নারীরা এককলসী পানির জন্য প্রানান্তকর চেষ্টা চালায় দিনভর। কৃষক পাচ্ছেনা সেচের জন্য ভূ-উপরিভাগের পানি, ভূ-গর্ভের অদৃশ্য পানি সম্পদ ধীরে ধীরে নীচের দিকে চলে যাচ্ছে। নেত্রকোনার সীমান্ত অঞ্চলের আদিবাসী সহ সকল পেশাবৈচিত্র্যের মানুষ আজ যেমন ভয়াবহ পানি সমস্যার সন্মূখীন হচ্ছেন তেমনি রাজশাহীর বরেন্দ্র ও উপকুলের মানুষ সুপেয় এককলসী হন্যে হয়ে ঘুরছে।পানির জন্য সীমান্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠি বিশেষ করে আদিবাসীরা নিরাপদ পানীয় জলের জন্য পাহাড়ের ছড়া থেকে বিন্দু বিন্দু ফোটা পানির জন্য দিনরাত অপেক্ষা করে এক কলসি পানি সংগ্রহ করেন। এককলসি পানির জন্য নারী পুরুষ কিশোরীর প্রানান্তর যুদ্ধ, নেত্রকোণার সীমান্তের গ্রামে আদিবাসি নারীদের পাহাড়ের ছড়ায় ঘন্টার পর ঘন্টা সময় ব্যয় করে এককলসি পানির জন্য।
নদী,হাওর, খাল, বিল, পুকুর, ছড়া, ঝরনা, পুকুর, দিঘি, ডোবা, নালা, সহ কত জলাধার বাংলাদেশে। পানি নিয়ে দেশে আছে একটি নীতিমালা ও একটি আইন । ‘জাতীয় পানি নীতি ১৯৯৯’ এবং ‘বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩’।পানি আইনে হয়েছে, পানি সম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা, আহরণ,বিতরণ,ব্যবহার, সুরক্ষা ও সংরক্ষণ সম্পর্কিত বিষয়ে বিধান প্রণয়ন সমীচীন বলে আইনটি করা হয়েছে। পানীয়জল আজ বহুজাতিক কোম্পানির বোতলে বন্দি। নামে বেনামে কত ব্যবসা ও কত লাভ লোভের জায়গা তৈরী হয়েছে এই পানি নিয়ে। ভূগর্ভের পানি টেনে তোলা হচ্ছে।আমাদের পাতালের পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। দেশজুড়েই প্রাণ ও প্রকৃতিতে সংকট চলছে। এর মানে হলো দেশে পানি যন্ত্রণাও চলমান আছে।
নেত্রকোনা জেলা কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের চন্দ্রডিঙ্গা, হাতিবের, পাচগাঁও, সন্নাসীপাড়া, জাকিরপাড়া, মনগড়া খারনৈ ইউনিয়নের ভাষাণকুড়া, কচুগড়া, বিশ্বনাথপুর, রানীগাঁও, খারনৈ, গোবিন্দপুর লেঙ্গুরা ইউনিয়নের চেংগ্নী, গোপালবাড়ী, ফুলবাড়ী, কালাপানি, কাঠাবাড়ী লোকজন তাঁদের সংকটের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, একসময় তাঁরা ওপারের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ছড়ার ময়লাযুক্ত পানিই কাপড় দিয়ে ছেঁকে কোনো রকমে পরিষ্কার করে পান করতেন। কিন্তু এখন ছড়াগুলোও শুকিয়ে খাঁ খাঁ করছে।চন্দ্রডিঙ্গার সাবিনা রেমা (৫৫) বলেন, সারা বছরই পানির সমস্যা থাকে।
পরিমল রেমা বলেন, ‘চন্দ্রডিঙ্গার আশপাশের অন্তত ৮টি গ্রামের লোকজন সীমান্তের জিরোলাইন থেকে তেলের টিন, কলসি, না হয় বালতি দিয়ে ঘাড়ে বয়ে পানি আনতে হয়। বছরের আট মাসই পানির জন্য সীমান্তের নারীরা বন, পাহাড়ের ছড়ার কাছে অপেক্ষা করেন। এই সমস্যা দীর্ঘ ২০/৩০ বছর ধরে চলে আসছে বলে জানান এলাকার ভূক্তভোগী আদিবাসি জনগণ। কলমাকান্দা এলাকা ঘুরে দেখা যায় যে, নারী, নারী শিশু, প্রবীণ নারীরাই বসতবাড়ি থেকে দূরের পাহাড়ের টিলা থেকে নেমে আসা নালা থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করেন নিরাপত্তাহীনতার ভেতর দিয়ে।
নেত্রকোনা সীমান্তে এলাকার সুমেশ্বরী, মহাদেও, নাগেশ্বরী, কংস নদীসহ সকল নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, জলবায়ু পরিবর্তন, জলাভূমির বিলুপ্ত, ভরাট এ অঞ্চলের পানি সংকটকে দিন দিন বাড়িয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশংকা করা হচ্ছে। নেত্রকোনার সমতলের নদী, হাওর, বিল খাল, পুকুরসহ সকল জলাধার আজ শুকিয়ে পানির জন্য এক ধরনের হাহাকার তৈরি হয়েছে।
কলমাকান্দার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে লেংগুরা, খারনৈ ও রংছাতি ইউনিয়ন মূলত পাহাড়ি এলাকা। এসব এলাকায় প্রধানত গারো ও হাজং সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। প্রায় ৩৫টি গ্রামে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গ্রামের বাসিন্দারা সাধারণত ছড়া, খাল ও কুয়ার পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চলমান তীব্র দাবদাহে সেগুলোও শুকিয়ে যাওয়ায় সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রামগুলোর ১৮ হাজার মানুষ। অনেক পাহাড়ি গ্রামে পানির অভাবে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে।
সুন্দর সুন্দর প্রতিপাদ্যে প্রতিবছরই পানি দিবসে আলোচনা হয়। কিন্তু প্রতিপাদ্যে কি পানির সমস্যা মিটে ? জাতিসংঘের সাধারণ সভায় অনুমোদনের পর ১৯৯৩ সালের ২২ মার্চ প্রথম পালিত হয় বিশ্ব পানি দিবস। জাতিসংঘ ঘোষিত প্রতিটি দিবসের মতোই পানি দিবসে প্রতি বছর একটি প্রতিপাদ্য থাকে। ১৯৯৪ সালের প্রতিপাদ্য ছিল, ‘পানি সম্পদ সুরক্ষা সবার দায়িত্ব’। ১৯৯৫ ‘নারী ও পানি’, ১৯৯৬ ‘তৃষ্ণার্ত নগরীর জন্য পানি’, ১৯৯৭ ‘বৈশ্বিক পানি কি যথেষ্ট’, ১৯৯৮ ‘ভূ-গর্ভস্থ পানি অদৃশ্য সম্পদ’, ১৯৯৯ ‘সকলেই ভাটিতে’, ২০০০ ‘একুশ শতকের জন্য পানি’, ২০০১ ‘স্বাস্থ্যের জন্য পানি’, ২০০২ ‘উন্নয়নের জন্য পানি’, ২০০৩ ‘ভবিষ্যতের পানি’, ২০০৪ ‘পানি ও দুর্যোগ’, ২০০৫ ‘জীবনের জন্য পানি’, ২০০৬ ‘পানি ও সংস্কৃতি’, ২০০৭ ‘পানিহীনতা’, ২০০৮ ‘পয়োনিষ্কাশন’, ২০০৯ ‘অভিন্ন জল ও জলের ভাগ’, ২০১০ ‘পানির গুণগত মান’, ২০১১ ‘নগরের জন্য পানি’, ২০১২ ‘পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা’, ২০১৪ ‘পানি ও শক্তি’, ২০১৫ ‘পানি ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন’, ২০১৬ ‘ভালো পানি ভালো কাজ’, ২০১৭ ‘কেন বর্জ্যপানি?’ ২০১৮ ‘পানির জন্য প্রকৃতি’।২০১৯ ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়, সবার জন্যই পানি। ২০২০ ‘পানি ও জলবায়ু পরিবর্তন’ ২০২১ ‘ভ্যালুয়িং ওয়াটার’ (মুল্যবান জল) ২০২২ ভূগর্ভস্থ পানি: অদৃশ্য পানি, দৃশ্যমান প্রভাব’’২০২৩ ‘ পানি ও পয়:নিষ্কাশন সমস্যা দ্রুত সমাধান করি,২০২৪ সালের প্রতিপাদ্য হলো,‘পানি শান্তির জন্য’।
সীমান্তে পানির সংকট ও যন্ত্রণা সামাল দেওয়া কোনো একক কর্তৃপক্ষের বা ব্যক্তির কাজ নয়। দরকার সামষ্টিক তৎপরতা। এলাকার নদী, হাওর, খাল, বিল, পুকুর, ছড়া, ঝরনা, পুকুর, দিঘি, ডোবা, নালা, সহ কত জলাধার আছে সেগুলো খননের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
———————- মো. অহিদুর রহমান আঞ্চলিক সমন্বয়কারী , বারসিক


























