মজিবর রহমান শেখ, ঠাকুরগাঁও , জনতারআদালত.কম । ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ।

বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর ও রাণীশংকৈল উপজেলার কিছু অংশ নিয়ে ঠাকুরগাঁও-২ আসন। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে আসনটি ধরে রেখেছেন আওয়ামী লীগের এমপি দবিরুল ইসলাম। একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁও-২ আসনে কে হচ্ছেন প্রার্থী এমন গুঞ্জন এখন সর্বত্র।
বর্তমান এমপি দবিরুল ইসলাম ছাড়াও আরো দুজন এ আসনে মনোনয়ন চাইছেন। মাঠে তাদের অবস্থান নীরব হলেও ভিত কিছুটা শক্ত। আর বিএনপিতে একাধিক প্রার্থী থাকলেও জামায়াত মরিয়া এ আসনে প্রার্থী নিশ্চিত করতে। বর্তমান এমপি দবিরুল ইসলাম পর পর ৬ বার এ আসনটি ধরে রেখেছেন আওয়ামী লীগের পালে। আর বিরোধী পক্ষ জামায়াতের প্রার্থী কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি এখানে। এবারও দবিরুল ইসলাম এ আসনে টিকিট পেতে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।
এছাড়াও আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাইছেন, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান প্রবীর কুমার রায় ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আলম টুলু।
অপরদিকে বিএনপি মনোনয়নের জোটের প্রধান দাবিদার জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আব্দুল হাকিম। তবে এবার বিএনপি এ আসনটি ছাড় দিতে নারাজ। এ কারণে বিএনপির মনোনয়ন পেতে একাধিক প্রার্থী মাঠে। তারা হলেন- কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা জেড মর্তুজা চৌধুরী তুলা ও ড্যাব নেতা ডা. আব্দুস সালাম।
বালিয়াডাঙ্গী ও হরিপুর উপজেলার তৃণমূল নেতাকর্মীরা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে এ আসনে প্রার্থী হিসেবে চাইছেন। আর এমনটি হলে আওয়ামী লীগের হাত থেকে আসনটি রক্ষা পাবে বলে মনে করেন তারা।
এদিকে জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আব্দুল হাকিম ২০০৮ সালের নির্বাচনে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হওয়ায় এবারও মনোনয়ন চাইবেন ২০দলীয় জোটের কাছে। সে ক্ষেত্রে এখন দ্বন্দ্বে ভুগছে বিএনপি-জামায়াত। জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল হাকিম বলেন, এই আসনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হলে ভোটাররা আমার পক্ষেই গণরায় দেবেন। পর পর দু’বারেই আমার বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। তবে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, জামায়াত পর পর দুবার নির্বাচন করে জয়ী হতে পারেনি। এবারও হলে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই এবার বিএনপির প্রার্থী দিয়ে আসনটি দখল করতে চায় বিএনপি। এ জন্য বিএনপি থেকে দুই নেতাই মনোনয়ন পেতে তদবির করছে দলীয় হাইকমান্ডে। এলাকার মানুষ আওয়ামী লীগের দুঃশাসন, নির্যাতন থেকে মুক্তি চায়। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এলাকার মানুষ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গণরায় দেবে বলে মনে করেন তারা। এজন্য বিএনপির নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান বালিয়াডাঙ্গী ও হরিপুর উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা।
তবে এ আসনটিতে ৯ম সংসদ নির্বাচনে সাড়ে ৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে যাওয়া জামায়াত নেতা মাওলানা আব্দুল হাকিম এবারও মনোনয়ন পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তবে তিনি এবার নিজ দল থেকে নির্বাচন করতে পারছেন না। ইতিমধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে।
এদিকে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার রায় এই আসনে এবার মনোনয়ন চাইছেন। দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। পাশাপাশি স্থানীয় ভোটারদের পাশে রয়েছেন অনেক আগে থেকেই। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার রায় সাধারণ মানুষের পাশে অবস্থান করছেন। একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও গেল বার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে সেবাও করতে পেরেছেন অনেক বার।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় তিনি স্কুল-কলেজ, মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। এলাকায় তিনি একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর দলকে শক্ত অবস্থানে নিয়েছেন তিনি। প্রবীর কুমার রায় বলেন, নির্বাচনে দলের কাছে মনোনয়ন চাইছি। যদি দল মনোনয়ন দেয় আমি নির্বাচিত হবো আশা করছি। যদিও এ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দবিরুল ইসলাম এমপি শক্ত প্রার্থী। তারপরেও দবিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ তুলেছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
এ ব্যাপারে দবিরুল ইসলাম এমপি বলেন, একটি বিরোধী পক্ষ আমার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। সে সব অভিযোগের কোনো ভিত্তি বা সত্যতা নেই। আমার পরিচ্ছন্ন ইমেজ নষ্ট করতে তারা উঠে পড়ে লেগেছে। আমি এই এলাকায় ৬ বার এমপি নির্বাচিত হয়েছি। মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে ছিলাম, আছি এবং থাকবো।
আরেকজন মনোনয়ন চাইবেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আলম টুলু। তিনি হরিপুর ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মানুষের কাছে যাচ্ছেন মাঝে মধ্যে।
১৯৮৬ সালে ৫ম সংসদ নির্বাচনে দবিরুল ইসলাম নৌকা মার্কা নিয়ে ভোট পেয়েছিলেন ৩৪ হাজার ৬২, ১৯৯১ সালে ৬ষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে দবিরুল ইসলাম ভোট পান ৪৬ হাজার ৪৫২, নিকটতম বিএনপির আলতাফুর রহমান পান ১৭ হাজার ৭০৭, ১৯৯৬ সালে ৭ম সংসদ নির্বাচনে দরিরুল ইসলাম ভোট পান ৪৮ হাজার ৩৪৪, নিকটতম ছিল জাতীয় পার্টির আসাদুজ্জামান বাবু। তিনি পান ২৮ হাজার ৭৫৭। ২০০১-এ ৮ম সংসদ নির্বাচনে নৌকা নিয়ে দবিরুল ইসলাম ভোট পান ৬২ হাজার ৪৮৩, নিকটতম ছিল জামায়াতের আব্দুল হাকিম। তিনি পান ৫৭ হাজার ১৯৬ ভোট। ২০০৯ সালের ৯ম সংসদ নির্বাচনে দবিরুল ইসলাম নৌকা প্রতীকে পান ১ লাখ ২ হাজার ৮৩৩, নিকটতম জামায়াতের আব্দুল হাকিম পান ৯৮ হাজার ৪৫৬ ভোট। আর ১০ম সংসদে বিএনপি- জামায়াত ভোট বর্জন করলে দরিরুল ইসলাম বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
সেই হিসাবে সব মিলিয়ে কখনো জামায়াত, কখনো বিএনপি আর কখনো জাতীয় পার্টির প্রার্থীর সঙ্গে লড়েছেন তিনি। প্রতিবারেই তিনি জয়ী হয়েছেন। দবিরুল ইসলাম এমপি বলেন, এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বিদ্যুতায়নসহ ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। এবারও মনোনয়ন পেলে আসনটি ধরে রাখতে পারবো। এবং এলাকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হবো। দলের হাইকমান্ডের কাছ থেকে এবারও সবুজ সংকেত পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এদিকে জাতীয় পার্টি ৩০০ আসনে একক প্রার্থী দিলে এ আসনে মনোনয়নের জন্য তোড়জোড় করছেন কেন্দ্রীয় মহিলা পার্টির সহ-সভাপতি নুরুন নাহার বেগম। তিনি এলাকায় নির্বাচনের জন্য প্রস্ততি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।


























