মজিবর রহমান শেখ, ঠাকুরগাঁও, জনতারআদালত.কম । ৫ নভেম্বর, ২০১৭ ।

ঠাকুরগাঁওয়ের চাঞ্চল্যকর মমিনুল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত আসামীর ১৬৪ ধারায় দায় স্বীকার করে দেওয়া জবানবন্দি লিপিবদ্ধে ত্রুটি ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য না থাকায় মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। মামলার রায়ে অসন্তুষ্ট হয়ে নারাজি দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি। ১ নভেম্বর বুধবার ঠাকুরগাঁও জেলা জজ আদালতের বিচারক আছাদুজ্জামান এ রায় প্রদান করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি শেখর কুমার রায় জানান, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের তৎকালীন বিচারক জুলফিকার আলী খান ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের ১৬৪ ধারা মোতাবেক মমিনুল হত্যাকান্ডের সাথে জরিত আসামী রাকিবের দায় স্বীকারের জবানবন্দি উক্ত আইনের ধারা অনুসরণ করে সঠিক ভাবে লিপিবদ্ধ করেন নাই। তিনি জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করার সময়, আমি ম্যাজিস্ট্রেট আপনি জানেন কি, আপনি দোষ স্বীকার করতে বাধ্য না এটা জানেন কি, আসামি পুলিশের হেফাজতে ছিলেন, তার জবানবন্দি পুলিশের ভয় দেখিয়ে নেওয়া হয় নাই, সে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিয়েছে এসব কথা বিশদ ভাবে সেখানে লিপিবদ্ধ না করার কারণে জবানবন্দি লিপিবদ্ধে ত্রুুটি হয়। এছাড়া মামলায় পুলিশ কোন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষী প্রদান করতেও পারেনি। তাই আদালত সাক্ষ্য প্রমান ও নথিপত্রগুলো দীর্ঘ পর্যবেক্ষন করে মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন।
কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ উক্ত রায়ে সন্তুষ্ট না হওয়ায় নারাজি প্রদান করেছেন উচ্চ আদালতে আপিলের জন্য। হত্যাকান্ডের স্বীকার মমিনুলের বাবা শাহাবউদ্দিন ফকির ও ভাই আমিনুল ইসলাম জানান, আমার ভাই মমিনুল হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করে ইতিপূর্বে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে স্বীকারোক্তি প্রদান করেছে আসামীরা। কিন্তু আসামীদের শাস্তির রায় না দিয়ে মামলা খারিজ করে দিয়েছে আদালত। এ রায়ে আমরা খুবই অসন্তুষ্ট। কিছুদিন আগেও আসামীদের পক্ষ হতে আমাদের পরিবারকে মামলাটি তুলে নেওয়ার জন্য টাকা দিতে চেয়েছিল। টাকা নিতে আমরা রাজি হয়নি। কারন আমরা মনে করেছিলাম আসামীরা যেহেতু আদালতে হত্যার কথা স্বীকার করেছে বিচার একটা হবেই। আমরা অসহায় বলেই চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের সত্যতা পেয়েও সঠিক বিচার পেলাম না।
মামলাটির রায় পুনরায় বিবেচনার জন্য আমরা উচ্চ আদালতে আপিলের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছি। আসামী পক্ষের আইনজীবি মকবুল হোসেন বাবু জানান, রাষ্ট্রপক্ষ অভিযুক্ত আসামিদের দোষি প্রমানিত করতে না পারায় আদালতের বিচারক সবকিছু বিবেচনা করে সঠিক রায় প্রদান করেছেন। এছাড়া মামলাটির ১৬৪ টি ধারায় যে জবানবন্দি নেওয়া হয়েছিল সেখানে কিছু তথ্য, প্রমানাদি সঠিক ছিল না বলে তিনি উল্লেখ করেন। ঠাকুরগাঁও জর্জ কোটের আইনজীবি মোস্তাক আলম টুলুর কাছে রায়কৃত মামলার ১৬৪ ধারার জবানবন্দির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যাকান্ড মামলায় একজন আসামী জবানবন্দি দিয়েছিলেন। কিন্তু ম্যাজিষ্ট্রেটের অজ্ঞতার কারনে সঠিক ভাবে জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়নি। এছাড়াও আসামীদের অভিযুক্ততা প্রমানিত করার জন্য কোন সাক্ষ্যই রাষ্ট্রপক্ষ দাখিল করতে পারেনি বলে হত্যা মামলাটি খারিজ হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আইনের মূল নৈতিকতার জায়গা থেকে প্রয়োজনে ১০ জন আসামী মুক্তি পাক, কিন্তু এক জন নিরপরাধ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পায়। আইনের ধারা অনুযায়ী একজনকে অপরাধী প্রমান করতে হবে, তখনই সে বিচারের আওতায় আসবে। জেলা আইনজীবি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন বলেন, মমিনুল হত্যাকান্ডে মামলার বাদী ছিল রাষ্ট্রপক্ষ। আদালত যেহেতু রায় প্রদান করেছেন প্রাথমিক ভাবে সেটি সঠিক। যতক্ষন পর্যন্ত উচ্চ আদালতে আপিল না করা হবে ততক্ষন পর্যন্ত রায়ের বিষয়ে দ্বিমত প্রশন করা ঠিক হবে না। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাবুল হোসেনের কাছে মমিনুল হত্যাকান্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৮ই মার্চ সকালে ঠাকুরগাঁও বিএডিসি খামারের পাশে আগুনে পুড়ানো বিকৃত অবস্থায় একটি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়।
পরে পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামী করে থানায় একটি মামলা দায়ের করে। লাশের মোবাইল ফোনের কল লিষ্ট দেখে পরিচয় ও হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে নিহতের ৩ বন্ধুকে আটক করা হয়। আসামীরা প্রথমে হত্যাকান্ডের দায় পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। পরে তাদেরকে আদালতে ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নিয়ে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। পরবর্তী মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বর্তমান কাহারোল থানার ওসি (তদন্ত) মফিজুল ইসলাম জানান, মামলার বাদী এসআই বাবুল হোসেন বদলি হওয়ার পর আমি তদন্তের দায়িত্ব গ্রহন করি। এর আগেই হত্যা মামলার আটক দুই আসামী জামিনে মুক্তি পায়। যেহেতু আসামী রাকিব (২১) হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করেন তাই ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন করার জন্য বিজ্ঞ আদালতে জামিন প্রদান না করার জন্য আবেদন করা হয়। তখন থেকেই আসামী রাকিব জেল হাজতেই রয়েছেন।
হত্যাকান্ডের সঠিক রহস্য বের করার জন্য মামলাটি পুলিশ সঠিক ভাবে তদন্ত করেছেন বলে তিনি জানান। আদালতে চার্জশিট দাখিলকারী কর্মকর্তা ও বর্তমান রাণীংশকৈল থানার ওসি আব্দুল মান্নান জানান, ২০১৪ সালে মমিনুল হত্যাকান্ডটি ছিল ঠাকুরগাঁওয়ের চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ড। পুলিশ তখন তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আসামীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। পরে আসামীরা আদালতে ১৬৪ ধারায় দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিল। হত্যাকান্ডের মূল রহস্য বের করে পুলিশ ৪ জনকে প্রাথমিক ভাবে দোষী প্রমানিত করে একই বছরের ২১ জুন আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। আমি আশাবাদী ছিলাম আদালত সঠিক রায় প্রদান করবেন।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৮ মার্চ সকালে সদর থানার পুলিশ শহরের বিএসডিসি খামারের পাশ থেকে মমিনুলের লাশ উদ্ধার করে। ওই দিনই এসআই বাবুল হোসেন বাদি হয়ে থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলার পর তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেনের নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত টিম গঠন করা হয়। এরপর সদর থানার পুলিশ অভিযান চালিয়ে হত্যার স্বীকার মমিনুলের বন্ধু রাকিব, মিজান ও হানিফকে গ্রেফতার করে। পরে পুলিশ আসামীদের আদালতে হাজির করলে রাকিব (২১) জেলা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের তৎকালীন বিচারক জুলফিকার আলী খানের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।
রাকিব হত্যাকান্ডের সাথে জরিত থাকার দায় স্বীকার করলে আদালত তাকে জেল হাজতে পাঠায়। ওই দিনেই চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের তৎকালীন বিচারক জুলফিকার আলী খান আসামী রাকিব হত্যার দায় স্বীকারের জবানবন্দি রেকর্ড ভুক্ত করেন। কিছুদিন জেল হাজতে থাকার পর আসামী মিজান ও হানিফ জামিনে মুক্তি পায়। ওই বছরের ৩ জুন হত্যা মামলাটি ফৌজদারী মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার আদেশ দেন ঠাকুরগাঁও জেলা দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন। পুলিশ কয়েক মাস তদন্ত করে হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন শেষে ২০১৪ সালের ২১ জুন আব্দুর রাকিব (২১), রিজভী (২২), হাবিবুর রহমান (২২), মিজানুর রহমান (১৯) আসামীদেরকে প্রাথমিক ভাবে দোষী গণ্য করে ঠাকুরগাঁও জেলা দায়রা জজ আদালতে চার্জশিট প্রদান করেন তদন্ত ওসি আব্দুল মান্নান।
সাড়ে ৩ বছর হত্যা মামলাটি ঠাকুরগাঁও জেলা দায়রা জজ আদালতে বিচার কার্য্যরে সাক্ষ্য, প্রমান, ১৬৪ ধারার জবানবন্দি পর্যালোচনা করা হয়। বুধবার (১ নভেম্বর) ঠাকুরগাঁও জেলা জজ আদালতের বিচারক আছাদুজ্জামান, আইনের ধারা অনুযায়ী হত্যাকান্ডের ঘটনায় ১৬৪ ধারার জবানবন্দি লিপিবদ্ধে নীতিমালা অনুসরন না করে ত্রুুটি থাকায় ও ঘটনার কোন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী না থাকায় মামলাটি খারিজ করে দেন। আসামীদের হত্যাকান্ডের বণর্না: রাকিব, মিজান, রিজভী ও হাবিবুর রহমান। খুব ভালো বন্ধু ছিলেন তারা। এদের মধ্যে মমিনুল ছিল বাকি ছয়জনের চেয়ে একটু স্বচ্ছল। তার ছিল একটি মোটরসাইকেল। আর সেই মোটরসাইকেল নিয়ে মাঝে মধ্যেই ঘুরে বেড়াতো তারা (বন্ধুরাই)।
তবে মমিনুলের মোটরসাইকেল নিয়ে এক সময় বন্ধুদের মাঝে হিংসার জন্ম দেয়। তার অনুপস্থিতিতে মোটরসাইকেলটি কিভাবে নেওয়া যায় এই পরিকল্পনা করতো বাকি বন্ধুরা। অবশেষে এলো ৭ মার্চ। সেদিন ছিল শুক্রবার। রাত ৯ টায় রাকিব জগন্নাথপুর বাড়ি থেকে বের হয়। কিছুক্ষনপর মিজান ও মমিনুল মোটরসাইকেল নিয়ে হাজির হয়। তখন মমিনুলসহ ৩ জনই শহরের আশ্রমপাড়ায় রিজভীর বাড়িতে যায়। শুরু হয় আড্ডাবাজি। রাত যত গভীর হয় আড্ডার মাত্রা ততোই বাড়তে থাকে। এরপর রাত ১টার দিকে এক মেয়ের সঙ্গে দেখা করার কথা বলে মমিনুলকে নিয়ে তারা শহরের বিএসডিসি ফার্মে নিয়ে যায়। সেখানে যাওয়ার পর মমিনুল জানতে চায় মেয়েটা কোথায়। এ সময় রাকিব জানায় মিজান নিয়ে আসতে গেছে। এরপর সেখানে বসে গল্প শুরু করে অন্য বন্ধুরা।
এ সময় পূর্ব পরিকল্পনা মত হাবিবুর রহমান পেছন থেকে মোমিনুলের মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করেন। মমিনুল উঠে দাড়ালে রিজভী ছুরি দিয়ে পেছন থেকে কোপ দেয়। এ সময় মমিনুল রিজভীর পা চেপে ধরলে ছুরি দিয়ে গলা কেটে ফেলে। মমিনুল রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে রাকিব ও মিজান বুকের উপর চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করে। রিজভী পেট্রল দিয়ে মমিনুলের মুখে দিয়াশালাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় যেন কেউ তাকে শনাক্ত করতে না পারে। বিকৃত হয়ে যায় মমিনুলের মুখ মন্ডল। পরে রাকিব, মিজান, রিজভী ও হাবিবুর রহমান বন্ধু মমিনুলের মোটরসাইকেলটি নিয়ে পালিয়ে যায়।


























