শামীম আল হাসান, জনতার আদালত.কম , ৮ জুলাই, ২০১৭ ।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরের দিকে তাকিয়ে আছেন দলটির নেতাকর্মীরা। কারণ এ সফরের মধ্য দিয়েই নির্বাচন ও প্রয়োজনে আন্দোলনের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হবে। দলের নীতিনির্ধারক বলছেন, লন্ডন থেকে ফিরলে বিএনপিকে নতুন রূপে দেখা যাবে। দেশে ফিরেই তিনি জাতির সামনে সহায়ক সরকারের ফর্মুলা দেয়া ছাড়াও নির্বাচন বিষয়ে অনেক কিছু খোলাসা করবেন।
খুলনা মহানগর বিএনপি আয়োজিত প্রাথমিক সদস্য নবায়ন ও নতুন সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা বলেন। আজ শনিবার দুপুরে খুলনা মহানগরীর হোটেল টাইগার গার্টেনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বর্তমান সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং আন্দোলন প্রশ্নে এখনও দোটানায় রয়েছে বিএনপি। দলের নেতারা নির্বাচনমুখী হবে, না আন্দোলনমুখী- এই প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতা মনে করেন, যেহেতু দেশব্যাপী বিএনপির পক্ষে একটি ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে, সেহেতু অবশ্যই আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে যাওয়া উচিত। আর কোনও কারণে নির্বাচনে না গেলে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

তবে সাংগঠনিক শক্তি আর ক্ষয় করবে না দলটি। নেতারা মনে করেন, আন্দোলনের নামে শক্তি ক্ষয় নিষ্প্রয়োজন। কারণ বর্তমানে মাঠে দলটির ভোটের যে শক্তি রয়েছে সেটাই সরকারের জন্য বড় আতঙ্কের বিষয়। তাই আন্দোলনের নামে কোনো ঝামেলায় না গিয়ে নির্বাচনের তফসিল পর্যন্ত আরও শক্তি সঞ্চয় করার ওপর অগ্রাধিকার দেয়া হবে। আর যদি সত্যিই আন্দোলন করতেই হয় তবে আন্দোলন যাতে সফল হয় সেদিকটাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও চোখের চিকিৎসার জন্য শিগগির লন্ডন যেতে পারেন খালেদা জিয়া। সর্বশেষ ২০১৫ সালের অক্টোবরে লন্ডনে চোখের চিকিৎসা করান তিনি। চিকিৎসকরা তখন বলেছিলেন ৯ মাস পর আবারো চেকআপ করাতে। কিন্তু তিনি প্রায় দেড় বছর যাবৎ নানা কারণে চেকআপ করাতে যেতে পারেননি। অসুস্থতার কারণে এবার পবিত্র মাহে রমজানে ওমরাহ করতে যেতেও পারেননি বেগম জিয়া।
এদিকে আর মাত্র দেড় বছর পরেই দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবারের লন্ডন সফরে পা ও চোখের চিকিৎসা করানো খালেদা জিয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য। তারপরও এবার লন্ডন সফরকালে পারিবারিক সফরের পাশাপাশি বড় ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দলীয় এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করবেন।
খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গীদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মা-ছেলের আলোচনায় মূল এজেন্ডা থাকবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং দলের জয়ের ব্যাপারে করণীয় চূড়ান্ত করা হবে। তাই স্বাভাবিকভাবে আলোচনায় স্থান পাবে দলের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকাও।
ওই সূত্রটি আরও জানায়, খালেদা জিয়া সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি তালিকা লন্ডনে নিয়ে যাচ্ছেন। তিন ক্যাটাগরি বিবেচনা করে এসব প্রার্থীর তালিকা করা হয়েছে। প্রথম বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একক প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলে ভোটের ফলাফল কী হবে, দ্বিতীয়ত- প্রতিটি আসনে তিনজন করে প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে কে কত ভোটে এগিয়ে থাকবেন এবং তৃতীয়ত- জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলে ফলাফল কী হবে। সম্ভাব্য এ তিন ক্যাটাগরির জরিপকে সামনে রেখেই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।
সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্তে চমক দেখা যেতে পারে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেমন বিভিন্ন পেশার ক্লিন ইমেজের লোকদের এনে দলের মনোনয়ন দিয়ে সংসদ সদস্য বানিয়েছিলেন, তেমনি এবার সেই পথ অনুসরণ করা হতে পারে। বিগত সময়ে যেসব মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তাদের অনেককেই এবার মনোনয়ন দেয়া নাও হতে পারে। এদের জায়গায় নতুন মুখ দেখার সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয় এমন নতুন মুখও মনোনয়ন পেতে পারেন।
এসব প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ইতিমধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন কর্তৃক ঘোষিত রূপকল্প ২০৩০ নির্বাচনে যাওয়ার জন্যই উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলেও বিএনপি তাতে অংশ নেবে। রূপকল্প-২০৩০ ঘোষণার পর তা নিয়ে দেশের মানুষ আজ উজ্জীবিত। ঠিক এমনিভাবে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা উপস্থাপন করবেন খালেদা জিয়া। আমরা প্রত্যাশা করি আগামী নির্বাচনে সহায়ক সরকারের যে রূপরেখা আমাদের নেত্রী দেবেন সেটা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ সহায়ক সরকার গঠনে তাদের সদিচ্ছা দেখাবে। অন্যথায় এ ইসু্যুতে দাবি আদায়ে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে আন্দোলন বিবেচনায় থাকবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি খুররম খান চৌধুরী বলেন, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি বাস্তবায়নে খালেদা জিয়ার দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে নিয়ে আমরা প্রস্তুত আছি। এ বিষয়ে তিনি যখন যা নির্দেশনা দিবেন এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে বাস্তবায়ন করব। আর সহায়ক সরকারের দাবি ক্ষমতাসীনরা মেনে নিতে রাজি না হলে বিএনপির শেষ অস্ত্র আন্দোলন। আন্দোলনে গেলে সেখান থেকে পেছন ফেরা যাবে না। এসব চিন্তাভাবনা করেই বিএনপি নতুন করে পরিকল্পনা করছে বলে তিনি জানান।


























