spot_img

উচ্চমাত্রার শব্দ জীবনের জন্য বিপদ সংকেত

আজ আন্তর্জাতিক শব্দসচেতনতা দিবস। প্রতিবছর এপ্রিল মাসের শেষ বুধবার আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস পালন করা হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য: উচ্চস্বরে শব্দ ও সঙ্গীত শ্রবণশক্তি হ্রাসের বিপদ সংকেত। শব্দদূষণ নীরব ঘাতক নয়, শব্দদূষণ মানুষের জন্য সরব ঘাতক ও শব্দসন্ত্রাণ।
আন্তর্জাতিকভাবে ১৯৯৬ সাল থেকে এ দিবসটি উদযাপন শুরু হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বের সাথে দিবসটি পালন করা হয়।। আমাদের দেশে ২০০৩ সাল থেকে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। শব্দদূষণের ফলে মানুষের বহুমাত্রিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিসমূহ হলো- মাথাব্যাথা, অনিদ্রা, কানে কম শোনা এবং আংশিক বা পুরোপুরি বধিরতা, কানের ভিতর ঝিঁঝিঁ শব্দ, র্শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার মনোযোগ কমে যাওয়া, মেজাজ খিটখিটে, মানসিক চাপ, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ, ক্ষুধামান্দ্য, গ্যাস্ট্রিক এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্ম হওয়া।
জনস্বাস্থ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনমানের ওপর শব্দের ক্ষতিকারক প্রভাবগুলো সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো ও শব্দদূষণের বিরুদ্ধে কার্যক্রম গ্রহনে কমিউনিটিকে উদ্বুদ্ধ করাই হলো এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে শব্দদূষণ বিষয়টি বিশ্বব্যাপী একটি অন্যতম জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক সময় সরকার শব্দদূষণ নিযন্ত্রণের জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরির্তন মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালনায় ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশিদারিত্বমূলক প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে জনগণকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি, শব্দদূষণ রোধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

ঢাকাসহ বড় বড় শহরের শব্দদূষণ অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। গাড়ির হর্ন, অ্যাম্বুলেন্সের মাত্রাতিরিক্ত শব্দ, আতশবাজির শব্দ, গণপরিবহন,মোটর সাইকেলে বিকট শব্দের হর্ন,নির্মাণ কাজের ইট পাথর ভাঙ্গার শব্দ,সভা সমাবেশের মাইক,প্রচার কার্যক্রম,সামাজিক অনুষ্ঠানের উচ্চ শব্দ ,সঙ্গীতানুষ্ঠানের সাউন্ডবক্স নিয়মনীতির তোয়াক্ষা না করেই বাজিয়ে চলছে। এসব শব্দের ঘনত্ব এতটাই বেশি যে গাড়ির কাচ বন্ধ রেখেও কিছুমাত্র রেহাই পাওয়া যায় না। পথচারী আর গণপরিবহন ব্যবহারকারীর কথা নাইবা বললাম। শব্দদূষণের অস্তিত্ব আগে রাস্তায় বের হলে টের পেতাম আর এখন বাসায় বসেই টের পাই ।
মাটি, পানি কিংবা বায়ুদূষণ উপলব্ধি করতে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু শব্দদূষণ সরাসরি আঘাত হানে আমাদের কানে, হৃদয়ে আর মগজে। তাই শব্দদূষণকে নীরব ঘাতক বলার আর কোনো সুযোগ নেই।

শব্দদূষণ বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী, ঢাকার জন্য দিনের বেলায় শব্দের আদর্শ মান ৬০ ডেসিবেল। অথচ স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় শব্দের গড় মাত্রা ৭৬ দশমিক ৮০ ডেসিবেল এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় শব্দের গড় মাত্রা ৮০ দশমিক ৫৬ ডেসিবেল। শব্দদূষণের কারণে আমাদের শ্রবণশক্তি কমে যাচ্ছে, বধিরতা বাড়ছে, মেজাজ খিটখিটে হচ্ছে, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে, শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দদূষণের প্রভাবটা সবচেয়ে বেশি পড়ে গর্ভবতী মায়েদের ওপর। গর্ভবতী মায়ের কানের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, বুক ধড়ফড়, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে। মা যখন উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন, ঘুম ঠিকমতো না হলে এর প্রভাব গর্ভেও সন্তানের ওপর পড়ে। শেষের তিন মাস গর্ভেও বাচ্চারা বাইরের শব্দ শুনতে পায়। উচ্চ শব্দে তাদেরও হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। এতে বাচ্চাদের শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়, ওজন কমে যেতে পারে, এমনকি সময়ের আগেই প্রিম্যাচিউর শিশুর জন্ম হতে পারে। এ জন্য গর্ভবতী মায়েদের ৮৫ ডেসিবলের অধিক শব্দের স্থানে যেতে বারণ করা হয়।

বাংলাদেশের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা (২০০৬) অনুয়ায়ী নীরব এলাকা, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা, শিল্প এলাকা ও মিশ্র এলাকার এই পাঁচটি জোনে দিনে ও রাতে আলাদা করে শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নীরব এলাকার জন্য দিনের বেলায় ৫০ ডেসিবল ও রাতে ৪০ ডেসিবল মাত্রা দেওয়া আছে। আবাসিক এলাকার জন্য শব্দের মাত্রা দিনে ৫৫ আর রাতে ৪৫ ডেসিবল। এখানে ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,ক. ভোর ৫টা হতে রাত ৯টা পর্যন্ত সময় ‘দিবাকালীন সময়’ হিসেবে চিহ্নিত।
খ. রাত ৯টা হতে পরবর্তী সকাল ৬টা পর্যন্ত সময় ‘রাত্রিকালীন সময়’ হিসেবে চিহ্নিত।
এদিকে আইনে ‘নির্মাণসামগ্রী (ইট ও পাথর) ভাঙার মেশিন আবাসিক এলাকার ৫০০ গজের মধ্যে সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত চালানো নিষেধ’ বলা হয়েছে।
বিধিমালার ৭ নম্বর ধারায় ‘শব্দের মানমাত্রা অতিক্রম নিষিদ্ধ’–এর বর্ণনায় বলা হয়েছে, অনুমতিপ্রাপ্ত না হলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো এলাকায় শব্দের মানমাত্রা অতিক্রম করতে পারবে না। দেখা গেছে, এ দেশে যেসব রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক অনুষ্ঠান আবাসিক এলাকায় আয়োজিত হয়, এর জন্য কখনোই কারও অনুমতি নিতে হয় না, এমনকি অনুমতি নেওয়ার যে একটা বিধি বা আইন আছে, তা–ও বেশির ভাগ মানুষ জানে না। যদি কেউ জেনেও থাকে তারা এসবের তোয়াক্কা করে না। গবেষণা থেকে স্পষ্ট যে, শব্দদূষণের সঙ্গে বধিরতার সম্পর্ক রয়েছে আকস্মিক তীব্র শব্দে অন্তত কানের ক্ষতির কারণে মানুষ আংশিক বা সম্পূর্ণ বধির হয়ে যেতে পারে। প্রতিদিন একজন মানুষ কতটুকু শব্দের মধ্যে অবস্থান করতে পারবেন এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত মানদন্ড দিয়েছে। ১৩০ ডেসিবেল ১ সেকেন্ডের কম , ১২৫ ডেসিবেল ৩ সেকেন্ড .১২০ ডেসিবেল ৯ সেকেন্ড ,১১৫ ডেসিবেল ২৮ সেকেন্ড ,১১০ ডেসিবেল ৩০ সেকেন্ড, ১০৫ ডেসিবেল ৪ মিনিট, ১০০ ডেসিবেল ১৫ মিনিট, ৯৫ ডেসিবেল ৪৭ মিনিট, ৯০ ডেসিবেল ,২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট, ৮৫ ডেসিবেল ৮ ঘণ্টা

অর্থাৎ একজন মানুষ প্রতিদিন কতটুকু শব্দের মধ্যে কত সময় ধরে অবস্থান করতে পারবেন, তার একটি সীমা রয়েছে৷ সেটি অতিক্রম করলেই তিনি ক্ষতির সম্মুখীন হবেনন। এই ক্ষতি শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির নয়, এটি সামষ্টিক কেননা, শব্দ দূষণজনিত অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রের চিকিত্সা খাতে ব্যয় বাড়ছে। অসুস্থতার জন্য একজন মানুষ যে অবদান রাখতে পারতো তা থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে৷ ভীষণরকম অসুস্থতা ছাড়াও শব্দদূষণ মনযোগে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে বিধায় মানুষ অনেক কাজ সুন্দরভাে করতে পারছে না । বিশেষ করে রোগী এবং শিশুরা এজন্য অধিক ক্ষতির শিকার৷ আর সুস্থ এবং বিকশিত প্রজন্ম তৈরির ক্ষেত্রেও শব্দদূষণ একটি বড় অন্তরায়৷ শিক্ষার্থীগণ শব্দদূষণের কারণে পড়ালেখায় ঠিক মতো মনযোগী হতে পারে না৷ কারণ পাশের বাড়িতে উচ্চশব্দে গান বাজছে, পাইলিংয়ের কাজ চলছে, ধর্মীয় সভা অথবা রাজনৈতিক সভা হচ্ছে৷ আমরা এগুলি করছি আনন্দ বা কল্যাণের জন্য৷ কিন্তু তা যদি ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে আমাদের ভাবতে হবে৷ কীভাবে শব্দদূষণ না করে এ কাজগুলি করতে পারি, সে উপায় বের করতে হবে৷
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশে কাজ হচ্ছে৷ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ধারাবাহিকভাবে জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে৷ অবশেষে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ সালের আলোকে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ প্রণয়ন করা হয়েছে৷ উক্ত বিধিমালায় শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে৷ শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ নির্দেশিত এলাকাভেদে শব্দের মানমাত্র, নীরব এলাকা দিনে ৫০ ডেসিমেল, রাতে ৪০ ডেসিমেল, আবাসিক এলাকা দিনে ৫৫ রাতের বেলা ৪৫, মিশ্র এলাকা দিনে ৬০, রাতে ৫০ বাণিজ্যিক এলাকাদিনে ৭০ রাতে ৬০ ডেসিমেল শিল্প এলাকা দিনে ৭৫ ডেসিমেল রাতে ৭০ ডেসিমেল। বায়ু, পানি ও মাটি দূষণের মতো শব্দদূষণ সেভাবে গুরুত্ব পায়নি শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬-এ বলা আছে প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসমূহ নিজ নিজ এলাকার মধ্যে আবাসিক, বাণিজ্যিক মিশ্র, শিল্প বা নীরব এলাকাসমূহকে চিহ্নিত করিয়া স্ট্যান্ডার্ড সংকেত বা সাইনবোর্ড স্থাপন ও সংরক্ষণ করবে, যাতে করে মানুষ বুঝতে পারে সে কোথায় কী করতে পারবে । রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে যে ট্রাফিক পুলিশ সারা দিন যান চলাচলে শৃঙ্খলা রক্ষার গুরু দায়িত্বটি পালন করছেন, শত কষ্টের পর আরও একভাবে তাকে খেসারত দিতে হচ্ছে।
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক সমীক্ষা বলছে, যানবাহনের শব্দ দূষণের কারণে ১১.৮ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশে জীবন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তাদের মধ্যে ১৫.৫ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশের সাধারণভাবে মোবাইল ফোনে কথা শুনতে অসুবিধা হয়, ১৯.১ শতাংশকে ঘরের অন্য সদস্যদের তুলনায় বেশি ভলিউম দিয়ে টিভি দেখতে হয়, উচ্চস্বরে কথা না বললে তাদের কথা শুনতে কষ্ট হয়, ৩৩.৯ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ উচ্চস্বরে কথা না বললে শুনতে পান না এবং ৮.২ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ কয়েকঘন্টা দায়িত্ব পালনের পর মাথা ঘোরা, বমি ভাব ও ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
গবেষণায় দেখা গেছে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শব্দদূষণ ওই যানবাহন থেকে হয়। আর সড়কে নানা ধরনের দূষণের জন্য ফিটনেসবিহীন গাড়ি অন্যতম কারণ।
মো. অহিদুর রহমান , পরিবেশ কর্মী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী , বারসিক।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

সর্বশেষ