spot_img

আফসোস ! ১৩ বছর পরেও জাতি ২১শে আগষ্ট হত্যাকান্ডের বিচার পায়নি

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম , প্রকাশক ,

জনতারআদালত.কম । ২১ আগষ্ট, ২০১৭ ।

 

২১ আগষ্ট, ২০০৪ সাল ।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশ ।

স্থান          : বঙ্গবন্ধু এভিনিউ আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে ।

সভাপতি  :  নগর পিতা মেয়র মোঃ হানিফ ।

প্রধান অতিথি  :  বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ।

 

লক্ষাধিক লোকের বিশাল সমাবেশ, মঞ্চ করা হয়েছে ট্রাকের উপর । ঢাকা মহানগরের আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা দিচ্ছেন । তখন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ ট্রাকের উপর বক্তৃতা মঞ্চে উঠলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ।

সবাই আশ্চর্য হলেন বরাবরের মতো এদিনও সভাস্থল ও আশপাশের এলাকায় কোন পুলিশী নিরাপত্তা না দেখে ।

সভার কাজ চলছে । কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বক্তৃতা শেষে জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন বক্তৃতা শেষ করলেন, ঠিক তখনই মঞ্চের উপর পরপর কয়েকটি বিকট শব্দ শুনতে পেলাম । চতুর্দিকে মানুষের দৌড়াদৌড়ি, কান্নাকাটি ভেসে আসতে লাগলো । মনে পড়ে গেলো ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী ময়মনসিংহ জেলায় প্রবেশ করেই সর্বপ্রথম আমার বাড়ীতে আক্রমণ করে নিরীহ মানুষের উপর মেশিনগান দিয়ে গুলি করার পর  চতুর্দিকে মানুষের ছুটাছুটি, কান্নাকাটির হৃদয়বিদারক দৃশ্য । আমাদের বাড়ীঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় পাক-হানাদার বাহিনী ও রাজাকারেরা । নারী-পুরুষের উপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে বিভিষীকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছলো ।

তখন আমি ছাত্রলীগ করতাম । বঙ্গবন্ধুর ডাকে এলাকায় এলাকায় জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ঐক্যবদ্ধ করছি । ঠিক তখনই দেশীয় মুসলিম লীগের দালালদের সহযোগীতায় আমার বাড়ী ও এলাকায় পাকবাহিনীর নারকীয় অভিযান, যা কোনদিনই ভুলবার নয় । স্বাধীন বাংলাদেশে সেই ভয়াবহ নারকীয় দৃশ্য যেন আবারও ২১শে আগষ্ট চোখের সামনে ঘটলো ।

বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী জনসভায় জননেত্রী শেখ হাসিনার উপর পরপর কয়েকটি গ্রেনেড হামলা, বহু লোক হতাহত অবস্থায় পড়ে আছে । বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে তাঁর নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষীরা প্রাণপণ চেষ্টা করে, এমনকি অনেকে নিজের জীবনের বিনিময়েও শেখ হাসিনাকে মহা বিপদের হাত থেকে রক্ষা করে গাড়ীতে তুলে নিয়ে ধংসযজ্ঞ এলাকা ত্যাগ করে নিরাপদ এলাকায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয় ।

মহান আল্লাহ তা’আলা যেন সেদিন নিজে স্বর্গ থেকে এসে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে শত্রুদের হাত থেকে প্রাণে রক্ষা করেন । চারিদিকে হতাহত মানুষের লাশ আর লাশ।

বাঁচাও-বাঁচাও , কান্নাকাটি, পানি দাও-পানি দাও, হাসপাতালে নিয়ে যাও– এসকল আর্তনাদ হচ্ছিলো সর্বত্র । এম্বুলেন্সের শব্দ চতুর্দিকে ।

https://www.youtube.com/watch?v=oCT7UnBnubU&t=55s

আমিও সেদিন প্রাণপণ চেষ্টা করে, জীবনের মায়া ত্যাগ করে অনেক হতাহতকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যালে গিয়েছি । শুনেছি হানিফ ভাই নিজে আহত অবস্থায় নেত্রীকে বাঁচিয়েছিলেন । প্রায় সকল কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ গ্রেনেডের আঘাতে আহত হয়েছেন । নারীনেত্রী আইভি আপাসহ শতশত লোক আহত অবস্থায় পড়ে আছে । এই হৃদয়বিদারক বিভিষিকাময় দৃশ্য দেখে আমার কনিষ্ঠ মেয়ে কন্ঠযোদ্ধা ফারহানা কালাম লিসার কন্ঠে রচনা হয় “আমি বিষাদ সিন্ধু পড়িনি, কারবালা প্রান্তর দেখিনি, আমি দেখেছি ২১শে আগষ্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা ” ।

এই দৃশ্য দেখে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার কর্মী যখন প্রতিরোধ গড়ে তোলে প্রতিবাদ করছিলো, তখনই এয়ারপোর্ট কাষ্টমস গোদামের লোডারদের ঘনিষ্ট বন্ধু, চোরাচালানী, ক্যাসিও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী – তারেকের বন্ধু বাবরের অনুচর পুলিশ বাহিনীর তল্পীবাহক কিছু পুলিশ এসে এলোপাতারি গুলি করে আওয়ামী লীগের প্রতিবাদকারী মিছিলকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে । সেই সময় পুলিশের পরিচালিত দমকল বাহিনী পানি দিয়ে হতাহতের সমস্ত আলামত ধুয়ে দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিলো ।

সেদিনের দমকল বাহিনী পানি দিয়ে রক্তাক্ত আলামত মুছে ফেলেছিলো ঠিকই কিন্তু আজও বাংলার মানুষের মন থেকে ২১শে আগষ্টের রক্তাক্ত অবস্থার বিভিষীকাময় দৃশ্য মুছে ফেলতে পারে নাই ।

সেদিনের হত্যাযজ্ঞ, নারকীয় দৃশ্য দেখার জন্য আসেনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অথবা তার কোন প্রতিনিধি । আসেনি কোন পুলিশ কর্মকর্তা বা সরকারী কোন দায়িত্ববান কর্মকর্তা । লজ্জার কথা, ঘৃণার কথা – হাসপাতালে আহত লোকদের চিকিৎসা কাজেও বাঁধা সৃষ্টি করেছিলো তখনকার সরকার। সেদিনের মর্মান্তিক ঘটনায় অনেক সাংবাদিক ভাইয়েরা আহত হয়েছিলো, কিন্তু ভেজা বিড়ালের মতো বিএনপির কোন নেতা আসেনি সামান্য সহানুভুতিটুকূ দেখাতে । আর আজ নিজেদের স্বার্থের জন্য সাংবাদিকদের কথা বলে চোখে গ্লিসারিন দিয়ে কান্নাকাটি করে ।

তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনা আহত অবস্থায় নিজে এবং বহু নেতৃবৃন্দসহ জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলতে চাইলেও বিএনপির স্পীকার জমির উদ্দিন সরকার কথা বলার অনুমতি দেয় নাই । এই মর্মান্তিক ঘটনায় বিশ্বের নেতৃবৃন্দ শোকবাণী ও দুঃখ প্রকাশ করেছে , কিন্তু আজ পর্যন্ত বিএনপি-জামাত এই হত্যাযজ্ঞ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ পর্যন্ত করে নাই । সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠায় তারেক-খালেদার পছন্দনীয় বিচারক জয়নাল সাহেবকে দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে, যাহার রিপোর্ট জাতি আজ পর্যন্ত জানতে পারে নাই ।

কিন্তু প্রবাদ আছে, ” আল্লাহর মাইর-দুনিয়ার বাইর ।” ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে কুটচালে ইয়াজউদ্দিন নিজেই যখন রাষ্ট্রপতি ও একাধারে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন, তখন বাংলার মানুষ খালেদার ষড়যন্ত্র বুঝে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রতিবাদমূখর হয়ে উঠে। তখন মতলব্বাজ ইয়াজউদ্দিন ষড়যন্ত্র আরম্ভ করে । তাহা বুঝে দেশের স্বার্থে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় নতুন কেয়ার-টেকার সরকার গঠণ করে ছবিসহ সুষ্ঠু ভোটার তালিকা তৈরি করে । পরবর্তী সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে । এই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে খালেদা জিয়া সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের বিরুপ মন্তব্য করে নির্বাচনের রায় প্রত্যাখ্যান করেছিলো ।সেনাবাহিনী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিএনপি-জামাত দোষারোপ করেছিলো । সেনাবাহিনী প্রধানকে আওয়ামী লীগের দালাল বলেছিলো খালেদা জিয়া ।

সরকার প্রধান নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা । আরম্ভ করা হলো ২০০৪ সালে সংঘটিত ২১শে আগষ্ট গ্রেনেড হামলার মামলা । সেদিন গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হয়েছিলেন । বাংলার মানুষ হারিয়েছিলো নারীনেত্রী আইভি রহমানকে । আহত হয়েছিলো শতশত নারী-পুরুষ । এখনো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিপ্লবী সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ শতশত লোক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে দিনাতিপাত করছেন। এর পরেও বিএনপি-জামাতের নেতা-কর্মীরা বলে দেশে গণতন্ত্র নেই ।

বিএনপি-জামাতের ভাইয়েরা কি অতীত ভুলে গেছেন ? কত মানুষ মেরেছেন, মনে আছে ? জবাব দিতে পারবেন ? নারায়ণগঞ্জের আওয়ামীলীগ অফিসে হত্যাকান্ড, ময়মনসিংহ সিনেমা হলে হত্যাকান্ড, সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যাকান্ড, আহসানউল্লাহ মাষ্টার হত্যাকান্ডসহ ইতিহাসের  জঘন্য জঘন্যতম ঘটনার জবাব একদিন দিতেই হবে এই বাংলায় ।

আপনারা শতশত কোটি কালো টাকা সাদা করেছেন, ৪৬০টি স্যুটকেস পাচার করেছেন, দেশের মানুষের সাথে বেঈমানী করেছেন । জাতির জনকের শাহাদাত বার্ষিকীতে জন্মদিন বানিয়ে কেক কেটে ফুর্তি করছেন।

আবারও বলছি, আল্লাহর মাইর, দুনিয়ার বাইর । পাপ কাজ করবেন না। পাপ কাজে সহায়তা করবেন না । মানুষকে ভালোবাসেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা করেন । দেশ আপনাদের অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু আপনারা দেশকে অসন্মান ছাড়া কিছুই দিতে পারেন নাই ।

২১শে আগষ্ট গ্রেনেড হামলার মামলার রায় খুব বেশী দেরী হলেও বিচারাধীন থাকায় মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। শুধু মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী মহোদয়কে জানাতে চাই, জাতি ১৩ বছর পরও উক্ত হত্যাকান্ডের বিচার এখনও পায় নাই বলে খুবই ব্যথিত ও দুঃখিত । জাতি এও মনে করে, আপনারা উক্ত মামলার বিচার কার্যে নিজেদের ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন ।

পরিশেষে বলতে চাই, দেশবাসী অতিসত্বর ২১শে আগষ্ট হত্যাকান্ডের বিচার দৃশ্যমান দেখতে চায় ।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

সর্বশেষ