ডেস্ক রিপোর্ট, জনতারআদালত.কম । ৩০ আগষ্ট, ২০১৭ ।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কন্ঠশিল্পী, বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ ও মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার আজ সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহে…রাজেউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।
দরাজ ও দরদীকণ্ঠের অধিকারী এ শিল্পী আধুনিক বাংলা গানের বিভিন্ন পর্যায়ে সাড়ে পাঁচ দশক মানবপ্রেম, ভালবাসা, লোকজ, দেশাত্ববোধক, মরমী, দ্রোহ, বিষাদ, প্রতিবাদী, উদ্দীপনা, চলচ্চিত্র, ভক্তিমূলকসহ নানা ধরনের গান গেয়ে সংগীত জগতের এক কিংবদন্তি শিল্পীতে পরিণত হন।
বিএসএমএমইউ’র পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুণ সাংবাদিকদের জানান, শিল্পী আব্দুল জব্বার আজ সকাল ৯টা ১০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউ’তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। তিনি আরো বলেন, শিল্পী দীর্ঘদিন যাবত ক্রনিক কিডনি ও হৃদরোগে ভুগছিলেন। আজ সকাল থেকে তার লিভার, কিডনি ও মাল্টিপোল অর্গান কাজ করা বন্ধ করে দেয়। আর এতেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) ইনচার্জ ডা: দেবব্রত বণিক বাসস’কে বলেন, শিল্পীর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গ অকার্যকর হয়ে পড়ায় তিনি আজ সকালে ইন্তেকাল করেন।
মৃত্যুকালে কিংবদন্তি এ শিল্পী দুই স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে এবং আত্মীয়স্বজনসহ অসংখ্য ভক্ত ও শুভাকাঙ্খী রেখে গেছেন।
শিল্পী আব্দুল জব্বারের হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক পরিষদের (আব্দুল জব্বার এ সংগঠনের সভাপতি) সাধারণ সম্পাদক আলী আশরাফ আখন্দ বাসস’কে জানান, শিল্পী তার প্রথম স্ত্রী হালিমা জব্বারের ঘরে ২ ছেলে মিথুন জব্বার ও বাবু জব্বার এবং এক মেয়ে টুনটুন জব্বার, আর দ্বিতীয় স্ত্রী শাহীন জব্বারের ঘরে একমাত্র মেয়ে মুনমুন জব্বারকে রেখে গেছেন।
হাসপাতালে শিল্পীর পুত্র মিথুন জব্বার বাসসকে জানান, অসুস্থ হয়ে পড়লে শিল্পীকে প্রায় এক মাস আগে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হতে থাকলে গত রোববার থেকে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।
তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে হাসপাতালে শিল্পীর সকল প্রকার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
শিল্পী আবদুল জব্বারের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
তার মৃত্যুতে আরো শোক প্রকাশ করেছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
বাংলা গানের এই কিংবদন্তি শিল্পীর মৃত্যুর সংবাদ দ্রুত রাজধানীসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক আইন মন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, শিল্পী তিমির নন্দী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছসহ সংস্কৃতি অঙ্গণের অনেকেই হাসপাতালে ছুটে যান।
হাসপাতাল থেকে শিল্পীর মরদেহ প্রায় ১২টার দিকে মোহাম্মদপুরের মারকাজুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শিল্পীর গোসলের কাজ শেষে তার মরদেহ কলাবাগানের ভুতের গলি ৫৭/সি, নর্থ সাউথি রোডের ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মহল্লাবাসীর শোক প্রকাশের পর তার মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিম ঘরে রাখার জন্য নিয়ে যাওয়া হবে।
সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য শিল্পীর মরদেহ আগামীকাল সকাল ১১ টা থেকে ১টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ জোহর নামাজে জানাজা শেষে শিল্পীকে দাফন করা হবে।
এ শিল্পীর প্রয়াণে সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, বাঙালির সংস্কৃতি ও সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া মানুষদেরই একজন ছিলেন শিল্পী আব্দুল জব্বার। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধে তিনি কণ্ঠসৈনিক হিসেবে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা এ শিল্পীর সঙ্গীত সংরক্ষণে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলেও মন্ত্রী জানান।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গোলাম কুদ্দুছ বলেন, মুক্তিযুদ্ধসহ জাতীয়তাবাদী সকল আন্দোলনে তার অবদান ভুলবার নয়। ৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানে তিনি কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে যে ভূমিকা রেখেছেন, তা অস্বীকার করা যাবে না।
শিল্পী আব্দুল জব্বার বঙ্গবন্ধুকে বাবা বলে ডাকতেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতির পিতার প্রতি তার ভালবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম, যা আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করেছে।
শিল্পী আবদুল জব্বার ১৯৩৮ সালে ৭ নভেম্বর কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করেন। ওস্তাদ ওসমান গণি ও ওস্তাদ লুৎফুল হকের কাছে তিনি সঙ্গীতে শিক্ষাগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালে প্রথম রেডিওতে এবং ১৯৬৪ সালে টিভিতে প্রথম কন্ঠশিল্পী হিসেবে গান পরিবেশন ও স্থায়ী শিল্পী হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন। শিল্পীর সংগীত জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অবদান হচ্ছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগদান।
অসংখ্য কালজয়ী গানে কণ্ঠ দেয়া এ শিল্পী মুক্তিযুদ্ধের সময় কাঁধে হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে গেরিলাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে উদ্দীপনামূলক গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এবং জনগণকে উজ্জীবিত করেন। ওই দুঃসময়ে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে অসংখ্য গান গেয়েছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এ শিল্পীর গাওয়া বিভিন্ন গান মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি দেশবাসীরও প্রেরণা ও মনোবল বাড়িয়েছে। গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে গণসংগীত গেয়ে প্রাপ্ত ১২ লাখ টাকা তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেছেন। ১৯৭১ সালে তিনি মুম্বাইয়ে ভারতের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জনমত তৈরিতেও নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
দেশের মানুষের ভালবাসার এ শিল্পী সঙ্গীতের নানা ঘরানার কয়েক হাজার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। এর মধ্যে দুই শতাধিক চলচ্চিত্রের গানও রয়েছে। তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে- তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়, এ ভুবনে কে আপন, এ মালিকে জাহান, আমার সে প্রেম, আমি বসন্ত হয়ে এসেছি, আমি এক নীড় হারা পাখি, আমি নিরবে জ্বলতে চাই, আমি প্রদীপের মতো আলো দিয়ে যাব, আমি তো বন্ধু মাতাল নই,ভালবাসা যদি, বিদায় দাও গো বন্ধু তোমরা, দু’জাহানের মালিক তুমি, এ আঁধার কখনও যাবে না মুছে, এক বুক জ্বালা নিয়ে, জানি কবিতার চেয়ে তুমি, কে যেন আজ ডেকে নিয়ে যায়, খেলাঘর বারে বারে, কি গান শোনাব ওগো বন্ধু, সালাম সালাম হাজার সালাম, ওরে নীল দরিয়া, মুখ দেখে ভুল করো না, মুজিব বাইয়া যাও রে, হাজার বছর পরে আবার এসেছি ফিরে প্রভৃতি গান।
আব্দুল জব্বারের গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়..’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম সকল শহীদ স্মরণে..’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়.., এ গান ৩টি ২০০৬ সালে মার্চ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলার শ্রোতাদের বিচারে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
যে সকল চলচ্চিত্রের গানে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন, সে চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে- মেঘের পর মেঘ, অধিকার, মাস্তান, জীবন তৃষ্ণা, আলোর মিছিল, জয় পরাজয়, মা, বেঈমান, ঝড়ের পাখি, আপন পর, দাতা হাতেম তাই, বিনিময়, এতোটুকু আশা, কত যে মিনতি, মানুষের মন, অবুঝ মন, ঢেউয়ের পর ঢেউ, অনুরাগ, দ্বীপ নেভে নাই, পীচ ঢালা পথ, ঘর জামাই, সারেং বউ, ঈমান, যে আগুনে পুড়ি, সাধু শয়তান, আগুনের আলো, শ্লোগান ইত্যাদি।
সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ তিনি বঙ্গবন্ধু পদক (১৯৭৩), একুশে পদক (১৯৮০) ও স্বাধীনতা পদক (১৯৯৬), জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাস আজীবন সন্মাননা, সিটিসেল-চ্যানেল আই সংগীত পুরস্কারসহ জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন্ পদক ও সম্মাননা অর্জন করেছেন।


























