অন্নদা শংকর রায় লিখেছিলেন, যতকাল রবে পদ্মা,মেঘনা গৌরি,মেঘনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান” তিনি বঙ্গবন্ধুকে নদীর শক্তির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন,তিনি টুঙ্গিপাড়ার নদীর কথা ভুলতে পারেন নি। তিনি লিখেছিলেন,পানির দেশের মানুষ আমরা পানিকে বড় ভালবাসি। তিনি আরো বলেছিলেন বাংলাদেশের উন্নতি করতে হলে নদীর উন্নতি করতে হবে। তিনি লোক গায়ক আব্বাস উদ্দিনের সাথে নদী পথে ভ্রমনের সময় নৌকায় বসে আব্বাস উদ্দিনের মুখে গান শুনেছিলেন বলেছিলেন “যে নদীর ঢেউগুলো যেন আব্বাস উদ্দিনের গান শুনছে।” বাংলাদেশে এক সময় ১২০০ মতো নদী ছিলো। বর্তমানে আমাদের নদীর সংখা বলা হচ্ছে ১০০৮ টি। নেত্রকোণায় নদী ছিলো ৮৭ টি। বর্তমানে চলমান আছে ১৭ টি। বাকীগুলো বিলুপ্ত,বিপন্ন ও বিপন্ন প্রায়। পৃথিবীর ইতিহাস খুঁজতে গেলে দেখা যায় যত বড়বড় মানবসভ্যতা গড়ে গড়ে ওঠেছিল সবই নদীতীরে, নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নগর, বন্দর, শহর, গ্রাম, জেলেপাড়া, বাণিজ্যকেন্দ্র। এই তরল মহাসড়কে ছিল আদিকালের যাতাযাতের সকল ব্যবস্থা । কৃষি সেচের,মাছের, জেলেদের পেশা , সংস্কৃতির, মানুষের নিত্যদিনের কাজের এই প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ নদী আজ দখল, দূষণ আর ভরাটের প্রতিযোগিতায় বিপন্ন আর বিলুপ্ত। নদী ,নালা,খাল,বিল, হাওর, ডোবা, জল জলাশয়, পুকুরে ঘেরা ময়মনসিংহ গীতিকার চারনভূমি , মহুয়া মলুয়ার, চন্দ্রাবতি, দেওয়ানভাবনা, কঙ্গলীলার কাহিনী খ্যাত,তলার হাওর,বাঘবার হাওর,ডিঙ্গাপোত হাওর,গণেশের হাওর, জালিয়ার হাওর সহ ১৩৫ টি হাওর, ৮৭ টি নদ নদী,খাল বিলের জলরাশির মাছে,খাদ্যে গড়ে ওঠা জনপদ, পাহাড় বনবাদার নলখাগরায় ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি নেত্রকোণা।
নেত্রকোনা জেলায় কত নামের নদীই না রয়েছে।কতইনা বাহারি নাম। যে নদীর জলে,ফসলে,খাদ্যে আমাদের জীবন গঠিত হয়েছে। মাথা উ”ু করে দাঁড়িয়ে আছি আমরা এই জনপদে সেইসব নদনদীকে আজ স্বরণকরি আপনমনে।সুমেশ্বরী, ধনু, মগড়া, কংস, ধলাই, ঘোড়াউৎরা, সাইঢুলি, বিষনাই, ধনাইখালি, গুনাই, পিয়াইন, পাঠেশ্বরী সহ ৮৫ টি নদনদী।
মগডা নদী বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নেত্রকোনা জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ১৪৮ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৭৭ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। ময়মনসিংহ শহর থেকে ১৪ মাইল পশ্চিমে সেনেরচরের নিকট পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের বামতীর থেকে খরিয়া নদী বের হয়ে ফুলপুর উপজলার পাশদিয়ে শিবপুরের নিকট কংস নদীতে পতিত হয়েছে। উক্ত খরিয়া নদী থেকে রাংশা নামে একটি শাখা নদী বের হয়ে দক্ষিণপুর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে বুরবুরিয়া বিলে পতিত হয়েছে। কংসের শাখা নদী আন্দাজোয়ারি ফেরিঘাটের নিকট থেকে বের হয়ে দক্ষিণদিকের বিল এলাকায় প্রবেশ করেছে এবং দুই শাখা বিভক্ত হয়ে একশাখা মগড়া নদীতে যুক্ত হয়েছে অন্য শাখা লাউরী নদী নামে নেত্রকোনা শহরের উত্তর পুর্বদিক দিয়ে পুনরায় মগড়ায় পতিত হয়েছে। মগড়ার এই মিলিত ¯্রােত শ্যামগঞ্জ নেত্রকোনা রেলপথ অতিক্রম কওে নেত্রকোনা দক্ষিণ পাশ দিয়ে আটপাড়া উপজেলার দিকে ধাবিত হয়েছে। ঠাকুরা কোনা থেকে কংসের একটি শাখা ধলাই নদী নামে আটপাড়ার নিকট মগড়াতে পতিত হয়েছে। নদীটি কোথাও ধলাই কোথাও মগড়া নামে পরিচিতি লাভ করে। মদনউপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ইটনার সন্ধবপুর গ্রামের নিকট ধনু নদীতে মিলিত হয়েছে।
মগড়া নদীর উৎস স্থল থেকে ধনু নদীতে পতিত হওয়া পয়ন্ত ১৪৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে। দুপাশে মগড়ার তীরে উপস্থিত গ্রামের সংখ্যা ১৩৪ টি। গ্রামের মানুষ তার কৃষি কাজের জন্য,গোসলের জন্য, গরুর গোসলের জন্য সবজী ও ধান ক্ষেতে সেচের জন্য ,চলাচলের জন্য মগড়া নদীকে একটি তরল মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহার করেছে। এই নদীর জলে কৃষকের গোলা ভরেছে ধানে,সবজী ,মসল্লায় ঘর ভরেছে। গ্রামের কৃষকের শত শত পাওয়ার পাম্প বসতো মগড়া নদীতে যে পানি দিয়ে রোরো মৌসুমের পুরো সেচের কাজ চলতো। বর্তমানে পানি না থাকার কারনে হাজার হাজার কৃষক ভুগর্ভের পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে এলাকার ভুগর্ভের পানির উপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ছে আয়রণ ও আর্সেনিক। পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু এখন আর মগড়ায় পানি নেই। ¯্রােত নেই। কৃষকের কৃষি খরচ বেড়ে গিয়েছে। পানি এখন কিনে আনতে হয় পয়সা খরচ করে। বিদ্যুতের লাইন সংযোগ না পেলে অনেক ফসলি জমি পতিত থেকে যায়। খাদ্য উৎপাদনও কমে যায়। :
নদী বিলুপ্তি, দখল, দূষণের ফলে জেলেরা পেশা হারিয়ে ভিন্ন পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। যে পেশায় সে বেমানান। পেশার পাশাপাশি জেলেদের মাছ ধরার উপকরণগুলো দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। নদী হারিয়ে মানুষ মাছের জন্য নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
নেত্রকোনা অঞ্চলের মাছ নাই, মাছ ধরার উপকরণও নেই, বিলুপ্ত ও প্রায় বিলুপ্ত কিছু মাছ ধরার উপকরণের নাম হলো: পলো ,ঝুপরা ,বুন্দা, চুকরা, লোহার কুচ ,জুইত্তা, এক কাইট্টা ,বাইড়( বড়), হগরা, উছ, চুঙ্গা,ঠেলা জালি ,টাক জাল, কনুই জাল, খরা জাল ,চটা জাল ,উতার জাল,বের জাল,চেলা জাল, লরি জাল, মই জাল,কৈই জাল, তিন কাইট্টা ,কাডা,চেং বাইড় ছোট ,লম্বা চেং, জাংলা সহ আরো অনেক মাছ ধরার উপকরণ আজ আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম চেনে না।
মগড়ার বিলুপ্তির কারণে পানির জন্য আজ হাহাকার, ভূগর্ভের পানি আজ অনেক নিচে নেমে গেছে। নদীর জলে এখন আর গোসল করতে পারিনা। নদীর দখল দূষণ আমাদেরকে শুধুই আহত করে। মগড়ার গর্ভে,পাড়ে আজ ময়লার স্তুপ,পানিতে ময়লা ,পাড়েময়লা, মৃতপ্রায় মগড়ার পাড়ের মানুষ আজ মগড়ার টলমল পানি দেখতে পায়না। কৃষকের মাটির নীচের পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।ফলে পানিতে বাড়ছে আর্সেনিক আয়রণ। যে মগড়ায় হাজার মানুষ গোসল করতো তারা আজা মাটির নীচের পানি বিদ্যুতের সাহায্যে উত্তোলন করে ব্যবহার করে।
নদীর সাথে আমাদের সংস্কৃতি বিশেষভাবে জড়িত।ছোট কবিতা, ছড়া, সনেট, কাব্য,গল্প,নাটক, উপন্যাস,গান, চলচ্চিত্র সকল কিছুতেই নদীকে কেন্দ্র নদীর কথা ,নদীর নানা উপকরণ, রসদ যোগিয়েছে। নেত্রকোনা অঞ্চলের মানুষকে দিনেদিনে কবি, বাউল,লেখক,গবেষক ,গায়ক ভাবুক করে তুলেছে এ অঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থা। ময়মনসিংহ গীতিকার অনেক গল্প,কাহিনী,শ্লোক, ছড়া, নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। নদী যত বিলুপ্ত হচ্ছে। মানুষ দিনদিন প্রকৃতি থেকে সড়ে যাচ্ছে। প্রকৃতি থেকে যত সড়ে যাবে তত বেশী মানুষ সংস্কৃতিহীন,বিপন্ন হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের নেত্রকোনার ওপর দিয়ে প্রবাহিত প্রধান নদীগুলোর উৎস হিমালয় পর্বত। বরফগলা পানি ও বৃষ্টির পানি প্রবলবেগে উত্তর থেকে দক্ষিণে সর্পিল গতিতে বইতে থাকে। এদের গন্তব্যস্থল বঙ্গোপসাগর।
মগড়ায় জল নেই আছে ফসলের ক্ষেত, পানির কলকল রব নেই আছে আবর্জনা, মাছ নেই আছে শুকনো মাটি। নেত্রকোনার মাটি মগড়ার দান, নেত্রকোনার সংস্কৃতি মগড়ার আর্শিবাদ,নেত্রকোনার কৃষি মগড়ার পানির দান। সেই মগড়ার প্রতি দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া মানে নিজেকে অপরাধি করে তোলা। নদী হারিয়ে যায় মানে কৃষি হারিয়ে যায়,সংস্কৃতি হারিয়ে যায়,ভাষা হারিয়ে যায়,নদী হারিয় যাওয়া মানে একটি জনপদ বিপন্ন হয়ে উঠে। মগড়া মরেনি ,মরে গেছি আমরা ,মগড়া নদী আমাদের কৃষি সংস্কৃতি,অর্থনীতির জন্য জরুরি । এই নদী খনন করে আমাদের জীবনকে টিকিয়ে রাখতে হবে।আমাদের সংস্কৃতিকে িিটকিয়ে রাখতে হবে।
এ অঞলের ঐতিহ্য যা ইতিহাস সবেতে নদী মিশ্রিত, নদী আশ্রিত, নদী প্রশ্রিত। পল্লীগীতি, জারি, সারি, ভাটিয়ালী প্রভিতিতে নদী বিমূর্ত, নদী জীবন্ত ,নদী উপাখ্যান। নদীর জলে অবগাহন, নদীর জলে পরিশুদ্ধি, নদীর জলে চাষবাস, ভূমি উর্বরা, পলি পতন, ভূমির পুষ্টি বৃদ্ধি, যোগাযোগ, যুগে যুগে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়েছে। নদী দিয়েছে, আমরা নিয়েছি, এভাবে নদী নিজেকে উজাড় করেছে। আমরা থেমে থাকিনি। আমাদের অভাব পূরণ হয়নি। আমাদের সীমাহীন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় নদী অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে।
নদীর পরিচর্যা কোন দিন আমরা করিনি। গতি পরিবর্তন, গতিরোধ, প্রবাহ বাধাগ্রস্থ প্রবাহবন্ধ, পানি প্রত্যাহার, বাঁধ নির্মাণ করে নদীর গতিকে রোধ করেছি, প্রবাহকে বন্ধ করেছি। আসুন আমাদের প্রয়োজনে মগড়া বাঁচাই, মাছ বাঁচাই, পেশা বাঁচাই,প্রাণবৈচিত্র্য বাঁচাই, প্রকৃতি বাঁচাই ,পরিবেশ বাঁচাই।
মো: অহিদুর রহমান
পরিবেশকর্মী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী, বারসিক ।


























