spot_img

কমছে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ

আয়তনে ছোট কিন্তু বৈচিত্র্যে অনন্য আমার প্রিয় দেশ বাংলাদেশ। উজান থেকে নেমে আসা অসংখ্য নদ-নদী ও স্রোতধারার বয়ে আনা পলিমাটিতে গঠিত হয়েছে ময়মনসিংহ অঞ্চলের পরিবেশ প্রকৃতি মানুষের জীবন। শত নদীবিধৌত সমতলভূমি, চরাঞ্চল টিলা, পাহাড়, হাওর, বিল,খাল,নালা, ছড়া, বাওড়, শাল বন, সবমিলিয়ে বাস্তুতন্ত্রের এমন বৈচিত্র্য বিরল। কিন্তু দেশের এই বৈচিত্র্য, প্রতিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র আজ চোখে পরেনা। চারিদিকে শুধু ক্ষয় আর বিনাশ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট, পুকুর ভরাট,নদী দখল,খাল দখল, বৃহৎ খনন,খননের নামে লুটপাট, রাসায়নিক কৃষি নানাভাবে ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রাণ-প্রকৃতির বিকাশকে রুদ্ধ করছে। আমাদের চোখের সামনে শহরের ঐতিহ্যবাহী পুকুর তিনকোনা পুকুর,গোলপুকুর,পচা পুকুর,তালপুকুর, পাকাঘাট পুকুর কিভাবে গর্বের সাথে ভরাট করছে,বিলিন হয়ে যাচ্ছে।

করোনা মহামারিকালে দুনিয়াব্যাপি এই উপলব্ধি আবার চাঙ্গা হয়েছে যে, প্রাণ-প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষা ছাড়া এই গ্রহে সকলের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের এই বিনামূল্যের অক্লান্ত সেবার জন্যই আমরা বেঁচে আছি। কিন্তু অকৃতজ্ঞের মতো মানুষই আবার বৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র নিদারুণভাবে বিনাশ করছে। দেশের নদী, মাটি, পাহাড়, অরণ্য, পাখি, বন্যপ্রাণ, জলাভূমি, উদ্যান সবখানেতেই মানুষের হানা আর পরিবেশের হাহাকার শুনতে পাই। জবরদস্ত মুনাফামুখী উন্নয়নের ক্ষত। এই ক্ষত মানুষকেই সারাতে হবে। নিজের বাঁচার প্রয়োজনে। পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের সেবা বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ একা কোনোভাবেই বেঁচে থাকতে পারবে না।

লাভ ও লোভের কারনে নষ্ট করছি পরিবেশ । বাড়ছে প্রাণের সাথে মানুষের সংঘাত, দ্বন্দ¦। নদী,নালা,খাল,বিল, হাওর থেকে পাখি মাছ এনে তার ছানাকে খেতে দিতো যখন প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে যখন মাছ ধরে আনতে পারছেনা তখন পাখি বাধ্য হয়ে মানুষের চাষ করা পুকুরে মাছের জন্য চলে যাচ্ছে । মানুষ তখন পাখিকে শিকার করছে। মা পাখি মারা যাওয়ার পর ছানাগুলোও মারা যায়। এভাবেই বন উজার করার পর হাতি খাদ্যের সন্ধ্যানে চলে আসে লোকালয়ে মানুষের জমির ফসল নষ্ট করলে মানুষ দলবদ্ধ হয়ে মেরে ফেলছে হাতিকে। সুন্দরবনের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে হরিণ কমে যাচ্ছে । বাঘের খাদ্য কমে যাচ্ছে , বাঘ চলে আসছে লোকালয়ে খাদ্যের সন্ধ্যানে। মানুষ নিরাপত্তার জন্য বাঘকে মেরে ফেলছে। পাখি ,হাতি ও বাঘের সাথে মানুষের দ্বন্দ্ব এভাবেই তৈরী হ”্ছ।ে কারণ আমরা পরিবেশের অনুষঙ্গগুলো নষ্ট করে ফেলছি। আর প্রাণীরা মেছে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে।
ময়মনসিংহ গীতিকার চারণভূমি খ্যাত এ অঞ্চলে শত শত জাতের ধান চাষ হতো। আজ সেই ধান আর নেই।

কৃষি জমি কমে যাচ্ছে, ইটখলা, কারখানা, গরুর ফার্ম, মৎস্যখামার,টাওয়ার,বসতবাড়ি তৈরী,প্রতিষ্ঠান তৈরী,অটোরাইসমিল বাড়ছে রাসায়নিক। প্রতিদিন ২২০ হেক্টর আবাদি জমি চলে যাচ্ছে অকৃষিখাতে। কমে যাচ্ছে বৈচিত্র্যতা,জাত,ঋতু,মাছ,পাখি,গাছ,বন,অনুজীব। কত জাতেরই না ধান ছিল রিবই, রতি শাইল,বদ্দিরাজ, বোরো আবজি, বোরো ঝাপি, বিন্নি, পঙ্খিরাজ, আইজং, চাপালি, কলমিলতা, নাতিশাইল, বাইগুনবিচি, কালিজিরা, পিপড়ার চোখ, চিনিশাইল, তুলসিমালা, নুইন্যা, বাদশাভোগ, চানমুনি, নুইন্যা(নেত্র), ভোলানাথ, জলকুমড়ি, তিলবাজাইল, মগি, শাইল আমন, খামা, আসকল, গইড্যামুড়ি, ঢেকিমালা,বিরন, কার্তিক শাইল, রাইমুহি, বাঁশফুল ,লালকুমড়ি, কার্তিক বিন্নি,

দুধবিন্নি, খাসিপুড়ি, সকালউড়ি, চাপশাইল, রাঙ্গাবিন্নি, নাজিরশাইল, কাজলশাইল, মৌবিন্নি, লক্ষ্মীবিলাস, চাপানলি, মনগিরি, সাদাবিরই,চিকনমালতি, আগুন্যাবিন্নি, লোহাজং,বাশিরাজ, চিনিসাগর, লালবিরই, পাইরজাত, আসাম বিন্নি, খাসিয়াবিন্নি, আসামমুনিয়া, দারিয়া, কালিগোবিন্দ, আটাবিন্নি, ফুলগাজিয়া, কাকুয়াবিন্নি, , মালশিরা, চানমনি, যতনবিন্নি, খাটোবাধা, ভূইট্টা আইজং, ভরত, ফুলবাইন, লালজিরা, লিলি, জটাশাল, খাকিবিরণ, মালতি, টলাবিরণ, কালামকুরি, সাদামোটা, বেনাপোল,জগড়থল, ঘুসি, দারশাইল,ধলাদিঘা, বগী আউশ, কাইশ্যাবিন্নি সহ অনেক ধান। সবকিছুই হারাতে বসেছি।

বাস্তুসংস্থানকে বোঝার জন্য আমরা পুকুরের উদাহরণ দিয়ে বুঝতে চাই। একটি পুকুরে নানা জাতের মাছ থাকে। যেমন, ছোট মাছদের ভেতর পুঁটি মাছ, টেংরা মাছ। আবার বড় মাছদের ভেতর রুই মাছ, বোয়াল মাছ। পুকুরে শ্যাওলা, শামুক, কীট, ব্যাঙাচি, ক্ষুদিপানা, শাপলা এসবও থাকে। পুকুরপাড়ে ব্যাঙ, পতঙ্গ, মেছোবাঘ থাকে। পুকুরের ধারে মানুষের ঘরবাড়ি থাকে। যদি পুকুরে সব শ্যাওলা মরে যায় বা যদি পুকুরপাড় থেকে ব্যাঙেরা কোথাও চলে যায় তবে কী হতে পারে? এমন ঘটলে পুকুরে খাদ্যসংকট দেখা দিবে, পরিবেশ বিনষ্ট হবে। সর্বোপরি এটি পুকুরধারের মানুষের পরিবারেও সংকট তৈরি করবে। কেন এমন ঘটে? কারণ প্রকৃতিতে গাছপালা, পশুপাখি, প্রাণহীন পরিবেশ ও মানুষের ভেতর নানামুখী সম্পর্ক বিদ্যমান। এরা প্রত্যেকই একে অপরের উপর নির্ভরশীল। কারণ সূর্যালোক ব্যবহার করে পুকুরের শ্যাওলাগুল্ম নিজেরাই নিজেদের খাবার উৎপাদন করে। এই শ্যাওলা পতঙ্গ, কীট, ক্ষুদে মাছের খাবার। আবার এদের খেয়ে বাঁচে বড় মাছ। বড় মাছ খায় মেছোবাঘ। মানুষও মাছ ধরে। আবার মানুষসহ নানা প্রাণী মারা গেলে তাদের শরীর ব্যাক্টেরিয়াসহ অণূজীবের মাধ্যমে পচনপ্রক্রিয়ায় আবারো মাটি ও পানিতে ফিরে আসে। এভাবেই এক জটিল খাদ্যচক্র। এটি প্রকৃতির একটি প্রজাতির সাথে অন্য প্রজাতির এক অনবদ্য খাদ্যশৃংখল। প্রকৃতিতে মানুষের সাথে অন্যান্য উপাদানের এই পরস্পরনির্ভরশীল সম্পর্কের ভেতর দিয়ে তৈরি আমরা মানুষ তা ভেঙ্গে দিয়ে নিজেদের বিপদ নিজেরা ডেকে আনছি।

পরিবেশ সংক্রান্ত রয়েছে অনকে জাতীয় ও আন্তর্জাকি আইন, নীতি, সনদ ও ঘোষণা। বিশ্ব পরিবেশের উন্নয়ন সংরক্ষণ বিষয়ে ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত ‘জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়ন সংক্রান্ত সম্মেলন’ থেকে ঘোষিত হয় ‘পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্পর্কিত রিও ঘোষণা ১৯৯২’। উক্ত ঘোষণার ২ নং নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে, জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালা অনুসারে এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের স্বীয় পরিবেশগত ও উন্নয়ন সম্পর্কিত নীতিমালা সাপেক্ষে নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। একই সাথে প্রতিটি রাষ্ট্রের এ দায়িত্বও রয়েছে যে, ঐ রাষ্ট্রের সীমার অধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে সংঘটিত কোন কার্যকলাপের ফলে যাতে অন্য কোনো রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় সীমার বাইরে কোনো এলাকার পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়।’ আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণের কিছু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ শুরু হয়। ১৯৭২ সনে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সম্মেলনের পর বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৪ সনে ‘পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ’ গঠন করে এবং ১৯৭৭ সনে ‘পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ’ জারি করে। ১৯৮৯ সনে বাংলাদেশ বনবিভাগ ও নতুন প্রতিষ্ঠিত পরিবেশ অধিদপ্তরসহ ‘পরিবেশ ও বন মন্ত্রণলায়’ গঠিত হয়। ১৯৯০ সনকে পরিবেশ বর্ষ ও ১৯৯০-২০০১ সনকে পরিবেশ দশক ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ ১৯৯২ সনে ‘জাতীয় পরিবেশ নীতি’ এবং ১৯৯৫ সনে ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন’ প্রণয়ন করে। জাতীয় পরিবেশ নীতির (১৯৯২) লক্ষ্যসমূহ হল : পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে বাস্তুসংস্থানিক ভারসাম্য ও সার্বিক উন্নয়ন সুরক্ষা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দেশকে রক্ষা, পরিবেশ দূষক ও ক্ষতিকর কর্মকান্ড সণাক্তকরণ ও নিয়ন্ত্রণ, সকলখাতে পরিবেশসম্মত উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ, সকল জাতীয় সম্পদের টেকসই দীর্ঘমেয়াদী ও পরিবেশ অনুকূল ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশ সম্পর্কিত সকল আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সঙ্গে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মাত্রায় কার্যকর সংযোগ রক্ষা। ২০১১ সনে পঞ্চদশ সংশোধনীতে ‘পরিবেশ সংরক্ষণকে’ সংবিধানের অন্তভূক্ত করে বাংলাদেশ পরিবেশবাদীতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে অনুচ্ছেদ ১৮ এর পর ‘পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের’ উক্ত নূতন অনুচ্ছেদ ১৮ক হিসেবে সন্নিবেশ করে উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যত নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা বিধান করিবেন। ‘পরিবেশ’ আজ কেবলমাত্র সংরক্ষণ বা পাবলিক ক্যাম্পেইনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকছে। সব আইন বিধি মেনে কি আমরা কাজ করছি?
পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতার মধ্যে আজ আমাদের বসবাস। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ,নিজস্ব জ্ঞান,নিজের সম্পদ হারিয়ে কোম্পানির কাছে বন্দী। আমাদের কৃষক কৃষাণীরা যখন বলেছিল বীজ হলো আমাদের সম্পদ,কেই তা মূল্যায়ন করেনি। গ্রামের মটকা -হাঁড়ি-শিশি-বোতল-ডুলি-কলস- সব শূণ্য করে বীজসম্পদ তুলে দেয়া হল বহুজাতিক কোম্পানির কাছে। হাজারো নামের ধান , শস্যের ফসলের বীজ নিরুদ্দেশ হয়ে গেল কয়েক বছরের মধ্যে। ব্রহ্মপত্রপাড়ের আবালবৃদ্ধবনিতা বলেছিল,ব্রহ্মপুত্র নদ আমাদের কৃষি,মাছ,পেশা,পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্রেও, সংস্কৃতির আধার। ব্রহ্মপুত্রকে বাঁচান সরকার বাহাদুর। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা কি ব্যবসায়ীরা তা শুনলো না। কলিজার সর্বশেষ রক্তবিন্দু ঢেলে আদিবাসীরা বলেছিল, আমাদের জীবনের জন্য ও জংগলকে বাঁচাও, দেশীয় গাছ বাঁচাও, জংগল না বাঁচলে পরিবেশ,প্রকৃতি বাঁচবেনা, আমরাও মরে যাবো। এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক কি অক্সিডেন্টাল-ইউনোকল ও শেভরনের মতো কোম্পানিরা তা শুনলো না।শালবন উপড়ে রাবার বাগান তৈরি করলো। প্রাকৃতিক বন কেটে আগ্রাসি গাছের বাণিজ্যিক বাগান তৈরি করা হল। পাহাড় কেটে তৈরি করা হল ক্যাম্প, অরণ্য সাফ করে বানানো হল বিমান বাহিনীর ফায়ারিং রেঞ্জ।

ময়মনসিংহ অঞ্চলেল নদ নদীতে ছিলো নানা বৈচিত্র্যর মাছ, ছোটবেলায় শুনেছি মাছের গল্প, মাছ ধরার গল্প, উইজ্যার গল্প, কাডা দিয়ে নদীতে মাছ ধরার কাহিনী, কিন্তুু নেত্রকোনার পাহাড়ি নদী, হাওর বিল, খাল, জল জলাশয়ে, মাছ কমে গেছে, মাছের বংশ ধবংস হওয়ার মতো পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ ও উন্নয়নের নামে বিষ, কীটনাশক,রোটানল দিয়ে, নদীতে হাওরে বাধ দিয়ে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজননে বাধাগ্রস্ত করার ফলে মাছের বৈচিত্র্য আর থাকছেনা। খর¯্র্েরাতা হাওরে রক্তিম রঙের পাখনা ও লেজ দোলানো সোনালি মহাশোল দেখা যায় না। শুধু মহাশোল নয় দেশীয় প্রজাতির মাছ রুই, কাতলা, বানেহুরা, রানীমাছ, বাগাইর, গুতুম, কাজলি, কালা বাউশ, কৈ, চিংড়ি, মাগুর, শিং, টেংরা, পাবদা, মলা, ঢেলা, চাপিলা, পাঙ্গাশ, শোল, চিতল, আইড়, মৃগেল, বাইম মাছ, কাছিম, সাপ, কাঁকড়া সহ নানা প্রজাতির জলপ্রাণীর ভান্ডার ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে।
বাংলাদেশের নদীর পানি বিষে পরিণত হয়েছে। পাানিতে আছে ক্যাডমিয়াম,তামা,দস্তা,লেড,নিকেল,ক্রোমিয়াম, পারদ, আর্সেনিক, বিষ, কীটনাশক,সহ নানা রাসায়নিক পদার্থ। দেশব্যাপী নদীর পানি দূষিত হচ্ছে এন্টিবায়োটিক বর্জ্যে, ২০০৯ সালে হেলসিংকিতে এক কনফান্সে ঘোষনা করা হয় বাংলাদেশের নদীর পানিতে এর মাত্রা সর্ব্বোচ্চ পর্যায়ে। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের ৫১ টি নদীর পানি গবেষণা করে দেখা গেছে পানিতে এন্টিবায়োটিক ও মেট্রোনিডাজলের পরিমান সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ গুণ বেশী।

সকল প্রাণবৈচিত্র্যেও মা হলো মাটি। সেই মাটি আজ বিষ, কীটনাশক,সিসা,এসিড সহ নানা রাসায়নিকের ভাগাড়। মাটি আজ অসুস্থ্য।

পলিথিন আজ পরিবেশ দূষণের জন্য ভয়াবহ হুমকি। নদীতে, ড্রেনে,খালে,সাগরে,মাছের পেটে,ডলফিলেন পাকস্থলিতে ,ঘরে ,খাদ্যে,ফ্রিজে, কোথায় নেই পলিথিনের রাজত্ব। যার ফলে ক্যান্সারসহ মরণব্যাধী আমাদের পিছু পিছু ঘুরছে।

এলেক্ট্রনিকস ময়লা আজ আমাদের জন্য ভয়াবহ সমস্যা তৈরী করছে। টিবি, ফ্রিজ,এসি,সিডি, অটো বেটারি,মোবাইল, চার্জার সহ সকল বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির রাসায়ানিক পদার্থ পানিতে ও বাতাসে মিশে যাচ্ছে। যা আমাদের পরিবেশ দূষণের বড় কারণ।

যেখানে সেখানে গরুর ও পোল্টির খামার গড়ে তোলা বায়ু দূষণ ,পানি দূষণ ও পরিবেশ দূষণের বড় কারণ।
পাখি,মৌমাছি,প্রজাপতি,ব্যাঙ বিলুপ্তি: পরিবেশ দূষণের কারনে প্রাণের যে,বৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে। ছোট ছোট এসব প্রাণ কমে গেলে পরাগায়ন কমে যাবে, ফলন কমে যাবে,আমরা বেশী দুর এগুতে পারবোনা।

ময়মনসিংহহ জেলা সদরের স্থানীয় লোকজন জানায়, জেলার পার্ক ও সার্কিট হাউজের আশেপাশের জায়গায় ছিল অনেক পুরনো কিছু গাছ। যে গাছগুলো শহরের ভারসাম্য রক্ষায় অনেকখানি সহায়ক ছিল। অনেক বছরের ঐহিত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর শাখায় শাখায় উড়ে বেড়াতো নানা প্রজাতির পাখী। হাজার হাজার পাখীর কলতানে মুখরিত হয়ে থাকতো এই স্থানটি। ঝাঁক বেঁধে তারা শূণ্যে উড়ে যেতো। গাছগুলো ঘিরে এখানে শহরের প্রবীন, যুবারা এসে বিশ্রাম নিত। বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে অনেকগুলো গাছ কেটে ফেলা হয়। এ তো গেলো জেলা শহরের একটি স্থানের গল্প। এমন শত শত গল্প ছড়িয়ে পুরো জেলা জুড়ে।

আমাদের শিশুরা সকালে ঘুম থেকে ওঠে নীল আকাশ দেখতে পারে না, বৃষ্টিতে ভিজতে পারেনা। খালি পায়ে ঘাসে হাঁটতে পারে না পাখীর ডাক শুনতে পারে না, নদীতে সাঁতার কাটতে পারেনা, গাছের ফুল ফল ফে^াটা দেখেনা, সেই শিশু সৃজনশীল, বিবেকবান, ন্যায়, সৎ, সাহসী ও আবেগপ্রবণ হবে না, বৈচিত্রময় হবে না, দেশপ্রেম তাঁর ভিতর জন্মাবেনা, হতে পারে না। কারন ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের সাথে মানুষের আচার আচরণ, কৃষ্টি সংস্কৃতি, রাজনীতির এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃতি অদৃশ্যভাবে চিরকাল সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। এই যে মানুষে মানুষে এত হানাহানি, বনিবনা হয় না ভাইয়ে ভাইয়ে, যৌথ পরিবার ভেঙ্গে টুকরো টুকরো, যুব সমাজ নেশাসহ নানা রকম অপরাধ কর্মে লিপ্ত, সংস্কৃতিতে পড়েছে ভাটা, ভাটা পড়েছে আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে- এগুলোর জন্যে দায়ী পরিবেশের বৈচিত্র্যহীনতা। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কোনভাবেই মানুষের মূল্যবোধগুলোকে জাগ্রত করতে পারছে না। এমনই সামাজিক পরিবেশের সঙ্কটময় অবস্থানে আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি।

মো. অহিদুর রহমান, পরিবেশকর্মী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী, বারসিক।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

সর্বশেষ