চৈতে গিমা তিতা, বৈশাখে নালিতা মিঠা,
জ্যৈষ্ঠে অমৃতফল আঢাষে খৈ, শাওনে দৈ।
ভাদরে তালের পিঠা, আশ্বিনে শশা মিঠা,
কার্তিকে খৈলসার ঝোল, অঘ্রানে ওল।
পৌষে কাঞ্ছি, মাঘে তেল, ফাল্গুনে পাকা বেল। খনা আরো হাজার বছর আগে এ প্রবাদের কথা বলেগিয়েছিলেন। ঋতু অনুযায়ি ফল,সবজী খাদ্য প্রকৃতিতে জন্ম নেয়। আমরা বেশী লাভ ও লোভের কারণে আমাদের প্রাকৃতিক খাদ্য সম্পদকে নষ্ট করছি।
চৈত্র মাসের সংক্রান্তিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায় অচাষকৃত তিতা স্বাদের শাক খাওয়ার নিয়ম। প্রতিটি ঋতুর সাথে কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্য জগতের সম্পর্কটি দিনে দিনে আর ঠিক থাকছে না। বথুয়া বিনাশের জন্য বাজারে আসে বিষ। যা আমাদের খাদ্যসংস্কৃতিকে আঘাত করার সামিল। আমাদের দেশের কৃ্ষি নীতিও এই ধরণের কুড়িয়ে পাওয়া সুস্বাদু শাকের প্রাপ্ততা নষ্ট করছে। আধুনিক কৃষি আবাদি ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলে, আর তার সাথে যা অনাবাদী হয়ে গড়ে ওঠে তাকে বলা হয় আগাছা। অথচ চৈত্র্য সংক্রান্তি আসলে বোঝা যায় এগুলো পাওয়া না যাওয়ার অর্থ হচ্ছে আমাদের বাড়ীর আশে পাশে নদীরপাড়ে ,পতিত জমি থেকে এসব অচাষকৃত খাদ্যসম্পদ উদাও হয়েছে অতিরিক্ত বিষ,কীটনাশক ব্যবহারের ফলে।
বৈশাখের শুরুতেই মা খালারা এসব তিতা শাক কুড়িয়ে আনতেন। হেলেঞ্চা, ঢেকি, সেঞ্চি, কচু, থানকুনি, তেলাকুচা, নটে শাক, গিমা, খারকোন, বতুয়া, দন্ডকলস, নুনিয়া, শুশ্নি, হাগড়া, পাট, সাজনা ইত্যাদী। এই শাকগুলো কোনটা বাড়ীর আশে পাশে, এমন কি খাল, পুকুর ডোবার ধারেও পাওয়া যায়।
বর্ষার দিনে হাওরে মেলে শালুক, পানিফল, ঢ্যাপ, কইর্যালি আর মাতুকঅচাষকৃত খাদ্যসম্পদ আছে বলেই জীবন সংগ্রামে ঠিকে আছে গেন্দুর মা ও জরিনারা । এই বুনোশাক কুড়িয়ে বাজারে ,বাসাবাড়ীতে বিক্রি করে জীবন চালাচেছন গেন্দুর মা,জরিনা, শুক্কুরী, আয়শা,আমেনা, আলেহা, মরিয়ম, চায়না, ময়না, নুরজাহান, বিলাসী,কাজলীসহ ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা অঞ্চলের ২১ জন নারী। কারও স্বামী নেই, কেহবা বিধবা ,কারও সংসারে অভাবের টানাপুড়েন । জীবনের চাকা সচল রাখতে জীবন সংগ্রামে এই বুনো শাকের উপর নির্ভর করছেন এই গ্রামীন নারীরা। ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা অঞ্চলের এসব নারীরা বনজঙ্গলে,ডুবা খানাখন্দ পারি দিয়ে,খালেবিলের জলে,নদী পেরিয়ে বিপদসংকুপ জায়গা বিচরণ করে কুড়িয়ে আনেন এসব বিষমুক্ত পুষ্টিকর খাদ্যসম্পদ। অধিকাংশ নারীর বাড়ী ব্রম্ভ্রপুত্র নদের আশেপাশে বিদ্যাগঞ্জ, মুক্তাগাছা,চরকালীবাড়ী, দাপুনিয়া, বাড়েরা,চরনিলক্ষ্মীয়া,নেত্রকোনার মৌগাতি,সাকুয়ার অধিবাসী।
এ সব শাকের মধ্যে কলমী শাক, হেলেঞ্চা শাক,গোল হেলেঞ্চা শাক, আগ্রা শাক, কচু শাক, গিমাই শাক, কচুর লতী, থানকুণী পাতা, কলার মোচা, দলকচু, সাঞ্চি, বেতশাক, ডুমুর, বউটুনি, শাপলা, ঘ্যাটকল, পেপুল তেলাকচু, সনচি, কাটানটি, ব্রাহ্মি, তিত বেগুন, কাটাকচু, বন কচু, ডুমুর, কলার মোচা বন আলু ।
বনকলার থোড় ও মোচা, কলমী, থানকুনি, বাঁশের কোড়ল, তেলাকুচা, ডেফল, ডেওয়া, গিমা, ঘৃতকাঞ্চন, কালমেঘ, শতমূলীর মতো বনজ খাদ্য-ফল-ঔষধি বিক্রি হতে দেখা যায় ময়মনসিংহ শহরের এই জরিনাদের কাছে। বাংলাদেশের খাল-বিল, নদী-নালা, পতিত জমি, বাড়ির আশপাশেই রয়েছে এসব উদ্ভিদবৈচিত্র্যগুলো যা মানুষের খাদ্যদ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আবার যেগুলো মানুষ খায় না সেগুলো পশু খাদ্য হিসেবেও স্বীকৃত। শুক্কুরী বেগম বলেন, আগে আছিল গরীরের খাওন ,এখন হইছে ধনীর খাওন। ধনী লোহেরা এহন এই হাগ কিইন্যা নেয়। জানা যায় প্রতিজন দিনে তিনশ থেকে সাড়ে তিনশ টাকার বিক্রি করে থাকেন । প্রতিমাসে আয় করেন নয় হাজার টাকার মতো।
ঋতুর যেমন বদল ঘটছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যের বৈচিত্র্য। কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যভান্ডার গ্রামীণ জনগণের দুর্দিন ও দূর্যোগের সাথী। বলা হয়ে থাকে অভাব, দুর্দিন, মংগা, নিদান ও দুর্ভিক্ষের কাল পাড়ি দেয় গরীব মানুষ পথেঘাটের কচু-ঘেচু খেয়ে। সত্যি হলেও এসব অবহেলিত কচু-ঘেচুই বাংলাদেশের অভাব ও দূর্যোগকাল পাড়ি দিতে শক্তি, আহার ও পুষ্টি জোগায়,আয়রণের অভাব পূরণ করে। হাওর জলাভূমি থেকে শালুক ,কুঁই কুড়িয়ে পুড়িয়ে খায় অনেকেই।
ময়মনসিংহ শহরের সাংকিপাড়া বাজার, বউবাজার, মেছুয়া বাজার, মিন্টু কলেজের সামনে রেল লাইনে,নেত্রকোনার ঘোষের বাজার, শাখ নিয়ে আসে গ্রামের এসব নারীরা । চরকরিচার কাজলী বলেন,“ আমাদের লাইগা বাজারে কোন জায়গাও নাই। যে বেলা যেহানে পারি বইয়া পরি।” এভাবেই চলছে এই পুষ্টি বিক্রেতাদের জীবন। কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যভান্ডার ঘিরে গড়ে ওঠেছে এক সমৃদ্ধ লোকায়ত জ্ঞান ও শ্রেণীকরণ বিজ্ঞান। কোনো শাক খাদ্য বা ঔষধ হিসেবে ব্যবহারের আগে অবশ্যই নিশ্চিত হওয়া জরুরি সেটি সঠিকভাবে সণাক্তকরণ হয়েছে কিনা। কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যভান্ডার গ্রামীণ জনগণের দুর্দিন ও দুর্যোগের সাথী। বলা হয়ে থাকে অভাব, দুর্দিন, মংগা, নিদান ও দুর্ভিক্ষের কাল পাড়ি দেয় গরীব মানুষ পথেঘাটের কচু-ঘেচু খেয়ে। সত্যি হলেও এসব অবহেলিত কচু-ঘেচুই বাংলাদেশের অভাব ও দুর্যোগকাল পাড়ি দিতে শক্তি, আহার ও পুষ্টি জোগিয়ে আসছে ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা অঞ্চর তথা সারা বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের। এখন এগুলো আর গরীবের খাদ্য নয়। এগুলো ধনীর খাদ্যও বটে।
ময়মনসিংহ গীতিকার মতো অনেক লোকজীবনের কাহিনী এখনো পড়ে আছে আমাদের সমাজের পরতে পরতে। আমরা তাদের চিনি না। আমাদেরকে শেকড়ের কাছে যেতে হবে। লোক জীবনের কথা তুলে আনতে হবে।তবেই আমরা সমৃদ্ধ হবো।
মো. অহিদুর রহমান,
পরিবেশকর্মী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী , বারসিক


























