27 C
Dhaka
বুধবার, আগস্ট ১০, ২০২২

অসাম্প্রদায়িক বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকেই সর্বাগ্রে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ করতে হবে

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম, প্রকাশক , জনতারআদালত.কম । ২০ নভেম্বর, ২০১৭ ।

 

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে গোল টেবিল বৈঠকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে হিন্দুদের জন্য ভারত ও মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্র ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতার সনদ পায়। পাকিস্তান নামক অদ্ভুত রাষ্ট্রটির দুটি প্রদেশ। একটি পশ্চিম পাকিস্তান অন্যটি পূর্বপাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তানকে বলা চলে মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশ। পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানের সংখ্যা বেশি হলেও হিন্দুদের সংখ্যা একেবারে কম ছিল না। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব ছিল ১২০০ মাইল।

পাকিস্তান শাসন করতো মুসলিম লীগ সাম্প্রদায়িক দলটি। তার নেতা ছিলেন কায়েদে আজম মোঃ আলী জিন্নাহ্ এবং লিয়াকত আলী খান। আর পূর্ব পাকিস্তান শাসন করতো তাদেরই দোসর পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ। যারা সার্কাসের পুতুলের মতো সুতোর গুটি ধরে রাখতো, তাদের ইচ্ছামতো পুতুল নাচাতো আর এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগের নেতারা এদিক ওদিক নাচানাচি করতো ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারের জন্য।

মুসলিম লীগের শাসন-শোষনে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালী জাতি যখনই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠল তখন মুসলিম লীগের নেতারা পরিকল্পিতভাবে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বা রায়ট বাধিয়ে দিত। এইসব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অনেক হিন্দু পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে মাতৃভূমি ছেড়ে ইন্ডিয়ায় চলে গিয়েছে। অনেক মানুষকে এই সব দাঙ্গায় নিহত হতে হয়েছে। আবার ওদিকে ভারতে হিন্দুত্ববাদি মৌলবাদীরা হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাধিয়ে দেয়ায় অনেক মুসলমান সর্বস্ব হারিয়ে পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। গোষ্ঠি স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তাদের শাসন ও শোষন দীর্ঘায়িত করার জন্য প্রায়ই দুই দেশে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাধিয়ে রাখত পাকিস্তানে মুসলিম লীগ ও ভারতের হিন্দুত্ববাদী -মৌলবাদী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক দলগুলি।

পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ মদদে বহুবার দাঙ্গা হয়েছে। অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে কিন্তু দাঙ্গা প্রতিরোধ হয়েছে, সংখ্যালঘুদের রক্ষা করেছে একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের নেতৃত্বে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো। আমরা মফস্বলে থেকেও শুনেছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একবার জীবনের মায়া ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে পুরান ঢাকায় মুসলিম লীগ চালিত হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিরোধ করেছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পাকিস্তানের পরাজিত শক্তির ইশারায় কিছু বিপদগামী সশস্ত্র ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নিহত করার পর আবার স্বাধীন বাংলাদেশে মুসলিম লীগের ভাব ধারায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাধিয়ে নিজেদের গোষ্ঠী স্বার্থে সুযোগ-সুবিধা লুটে নিচ্ছে। এইতো সাম্প্রতিক কালের কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসির নগর, দিনাজপুরের সাওতাল পাড়া ও সর্বশেষ রংপুরের পাগলা পীর ঠাকুর পাড়ায় হিন্দুপল্লীতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে ঐ মৌলবাদী গোষ্ঠী। এক বছরে পাকিস্তানি পরাজিত শক্তি বেশ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। পরিবর্তন শুধু কুশিলব আর স্থান । ঘটনা ও উদ্দেশ্য একই। রসরাজের জায়গায় টিটু রায়, নাসিরনগরের জায়গায় রংপুরের পাগলপীর ঠাকুরপাড়া গ্রাম, আর কিছুই পরিবর্তন হয় নাই।

৫ই নভেম্বর থেকে উত্তেজনা বিরাজ করছিলো পাগলাপীর ঠাকুরপাড়া গ্রামে। ঐ গ্রামের খগেন্দ্র চন্দ্রের ছেলে টিটু রায় নাকি তার ফেসবুকে ইসলাম বিরোধী পোষ্ট দিয়েছিল। আমার মুসলমান ভায়েরা এই জন্য টিটু রায়ের বিরুদ্ধে মামলাও করেছিল কিন্তু মামলার বিচার কাজ না দেখে ৫ তারিখ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত মাইকিং করে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টির মাধ্যমে ১০ নভেম্বর শুক্রবার মানববন্ধনের ডাক দেন বিএনপি-জামাত মৌলবাদী গোষ্ঠী। পাশের এলাকা জলঢাকা ও তারাগঞ্জ থেকে ২৫-৩০ হাজার মানুষজন লাঠি সোটা নিয়ে উক্ত মানববন্ধনে জমায়েত হয়।

জুম্মার নামাজের খুতবা পাঠের সময় উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে মানববন্ধনে আসা মানুষদের হিন্দুপাড়ায় আক্রমণের জন্য আহ্বান জানানো হয়। যার অগ্রভাগে ছিল ওই এলাকার চিহ্নিত জামাত-শিবির মৌলবাদী গোষ্ঠী। আল্লাহ আকবর শ্লোগান দিয়ে মৌলবাদী গোষ্ঠী হিন্দুদের বাড়ি-ঘরে আগুন দেয় ও লুটপাট চালায়। পুলিশ ছিল মাত্র শ’খানেক। পুলিশকে ধন্যবাদ, তারা সংখ্যায় কম হলেও আপ্রাণ চেষ্টা করেছে দাঙ্গা প্রতিরোধ করার জন্য। মৌলবাদীরা মারমুখী হওয়ার কারণে পুলিশের গুলিতে একজন দাঙ্গাবাজ মারা যাওয়ার প্রেক্ষিতে দাঙ্গাবাজরা আরও ব্যাপকভাবে ক্ষতি করার চেষ্টা করে কিন্তু পরে পুলিশের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেলে দানবের দল তাদের মতলব হাসিল করে স্থান পরিত্যাগ করে চলে যায়। কিন্তু নিয়ে যায় ওই গ্রামের হিন্দুদের সহায়-সম্বল এবং পুড়িয়ে দিয়ে যায় ভিটে বাড়ী-ঘর।

প্রিয় পাঠক, ঘটনার পূর্বাপর সবই জানলেন, এখন প্রশ্ন জাগে, বিশেষ করে ওই এলাকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঘটনার পূর্বে ৫দিন কোথায় ছিলেন ? তারা মৌলবাদীদের প্রতিরোধ করার জন্য কি কোনরূপ রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েছিলেন ? মৌলবাদীরা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সৈনিকদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ? অবশ্যই না ! তবে কেন দানবদের প্রতিরোধ করতে পারল না ? অনেকেই বলেছেন আওয়ামী লীগের ইচ্ছা থাকলেও প্রতিরোধ করতে পারে নাই। কারণ আওয়ামী লীগের ভেতরে সুকৌশলে জামাত-শিবিরের ভাবধারায় অনেক মুখোশধারী হাইব্রিড আওয়ামী লীগার দলে ঢুকে পড়েছে।

 

স্থানীয় লোকজন মনে করেন, আওয়ামী লীগ যদি ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের অসাস্প্রাদায়িক নেতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে দানব প্রতিরোধ কল্পে ঝাঁপিয়ে পড়ত তবে অবশ্যই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজদের দমন করা যেত। আমাদের পুলিশ বাহীনিও আরও উজ্জিবিত হয়ে দমন অভিযান পরিচালনা করতে পারত। আমাদের পুলিশ বাহিনীই জনগণের সার্বিক সহযোগিতায় জঙ্গি গোষ্ঠী দমন করে দেশকে সারাবিশ্বে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অংশগ্রহণ করেছেন। ঐ এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা কি কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে জবাবদিহি করেছেন, নাকি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ তাদের কাছে ব্যর্থতার জবাবদিহি চেয়েছেন ? জাতি অপেক্ষা করবে এই প্রশ্নের সঠিক জবাব পেতে।

সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বি.এন.পি নেত্রী ভারতের কাছ থেকে আশাভঙ্গের বার্তা পেয়ে দারুণভাবে হতাশাগ্রস্ত। রাজনৈতিক কূটচাল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভারতের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করার উদ্দেশ্যে এমন আরও দাঙ্গা সৃষ্টি করবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তথা বঙ্গবন্ধুর আর্দশের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান_ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী কর্মীদেরকে আরও চাঙ্গা করুন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজদের প্রতিরোধ করার দৃপ্ত শপথ নিন নতুবা পরাজয়ের আঁচ করতে পেরে পাকিস্তানী পরাজিত শক্তি নির্বাচনকে বানচাল করে দিবে। প্রত্যেক এলাকায় স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিকে চিহ্নিত করুন, প্রশাসনে লুকিয়ে থাকা তাদের দোসরদের প্রতি নজর রাখুন।

অনুগ্রহ করে মনে রাখবেন ভারতের চেয়ে চীন সর্ব ক্ষেত্রেই শক্তিশালী যাহা ভারতবাসীর কাম্য নহে কিন্তু হিন্দু মৌলবাদীদের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও মাওবাদীদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে ভারত আজ সর্বক্ষেত্রে চীনের পেছনে। সুতরাং দেশের সার্বিক মঙ্গলের জন্য জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আওয়ামী লীগ ও তার আদর্শের ধারক বাহক অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী তথা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসীদের আমাদের দেশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজ ও ধর্মীয় মৌলবাদ জঙ্গি গোষ্ঠী অবশ্যই সর্বাগ্রে প্রতিরোধ করতে হবে। । তাই সকলকে সজাগ থাকতে হবে। সাবধান থাকতে হবে, যেন পাকিস্তানী পরাজিত শক্তি দানবের দল আর কোথাও সংখ্যালঘুদের উপর আঘাত হানতে না পারে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাথে থাকুন

13,562FansLike
5,909FollowersFollow
3,130SubscribersSubscribe

সর্বশেষ