32 C
Dhaka
বুধবার, জুলাই ২৪, ২০২৪
spot_img
spot_img

কৃষি, কৃষক, প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষায় বঙ্গবন্ধুর ভাবনা

নদীর পলি দ্বারা গঠিত উর্বর বাংলার মাটি। সেই মাটিই বাংলার সম্পদ। দেশের খাদ্যযোদ্ধারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেই দেশের মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন করেন। ১৯৭১ সালের পর যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশকে প্রথমেই বঙ্গবন্ধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন। বিদেশি এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার আছে সুজলা- সুফলা- শস্য- শ্যামলা বাংলার মাটি আর আছে সোনার মানুষ। এই দুই দিয়েই আমি সোনার বাংলা গড়ব।’ ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাদের গ্রামের দিকে নজর দিতে হবে। কেননা, গ্রামই বাংলাদেশের উৎপাদনের মূল কেন্দ্র। গ্রামের উন্নয়ন ও কৃষকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারলেই সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারবো। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির রূপরেখা দিয়েছিলেন। তিনি বাংলার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির কথা ব্যক্ত করেছিলেন রেসকোর্স ময়দানে। ৭ নভেম্বর এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, আইনের চোখে সাড়ে সাত কোটি মানুষের যে অধিকার ,কৃষকের সেই অধিকার, সরকারী কর্মচারীদেরও সেই অধিকার।”
বঙ্গবন্ধুর মূল শক্তি ছিল এ দেশের মানুষকে ভালোবাসা। একইসঙ্গে তিনি বাংলার মাটি, জল, সবুজ প্রকৃতি, পরিবেশকেও গভীরভাবে হৃদয়ে ধারণ করতেন। তাই তিনি উপলব্ধি করেন, সাড়ে সাত কোটি মানুষকে বাঁচাতে হলে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের বিকল্প নেই। এ জন্যই স্বাধীনতার পরপর ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা গড়তে বঙ্গবন্ধু খাদ্যের বহুমুখিতার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন, ‘খাদ্য বলতে শুধু ধান, চাল, গম ও আটা, ময়দা আর ভুট্টাকে বোঝায় না; বরং মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাকসবজি, ফলমূল এসবকেও বোঝায়।’ ফলে তিনি সামগ্রিক কৃষি ক্ষেত্রের উন্নয়ন চেয়েছিলেন। সামগ্রিক কৃষিক্ষেত্রের মধ্যে শস্য, বীজ, তৈল, পশু সম্পদ, বনজ সম্পদ, নদী, জলাশয় প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে কৃষি গ্রাজুয়েটদের আহŸান করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আপনারা যারা কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছেন। আপনাদের গ্রামে গিয়ে কৃষকের সঙ্গে মিশে যেতে হবে, মনোযোগ দিতে হবে তাদের চাহিদা আর কর্মের ওপর, তবেই তারা সাহসী হবে, আগ্রহী হবে, উন্নতি করবে। ফলাবে সোনার ফসল। গ্রাম উন্নত হলে দেশ উন্নত হবে। কৃষককে বাঁচাতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে। তা না-হলে বাংলাদেশেকে বাঁচতে পারব না।’

বঙ্গবন্ধু জানতেন নদীনালা, খাল-বিল গ্রামীণ পরিবেশের অন্যতম অনুষঙ্গ। কিন্তু বর্ষায় আকস্মিক ভারী উজানের ঢলে পাহাড়ি বন্যার প্রাদুর্ভাব এবং চৈত্র মাসের খরা ও বৃষ্টিহীনতার দরুণ পানির অভাব গ্রামীণ জনজীবনে বয়ে আনে দুর্ভোগ। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ মোকাবেলায় পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা গ্রহণে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড গঠন করেন। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী চিন্তায় ১৯৭২ সালেই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানির হিস্যা আদায়ে যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুই প্রথম নদীর নাব্যতা রক্ষার্থে ১৯৭২ সালে নেদারল্যান্ডস সরকারের সঙ্গে নদী খননের জন্য ড্রেজিংয়ের চুক্তি সম্পাদন করেন। সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে সবুজ বিপ্লব সফল করতে নদীমাতৃক আবহমান বাংলার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াস, নদীভাঙন ইত্যাদি দুর্যোগ প্রতিরোধে বঙ্গবন্ধু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ১৯৭৩ সালে নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ হাওর উন্নয়ন বোর্ড ও নারায়ণগঞ্জ ড্রেজার পরিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নেন। বঙ্গবন্ধুর আমলে চারটি ড্রেজার ক্রয় করা হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অভিঘাতগুলো মোকাবেলায় বনায়ন খুবই কার্যকর উদ্যোগ। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই উপকূলীয় বনায়নের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৭২ সালে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বনজসম্পদের অবৈধ পাচার রোধে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস ফরেস্ট ট্রানজিট রুলস-১৯৭৩ জারি করেন। এ ছাড়া প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন-১৯৭৪’ বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলে প্রণয়ন করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘনঘন সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়, বাংলা, বাংলার মাটি, জল, নদী, জলাশয় প্রাকৃতিক পরিবেশকে বঙ্গবন্ধু নিবিড়ভাবে আয়ত্ব করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের পরিবেশ প্রকৃতিকে, বাংলার মানুষকে জানতেন, চিনতেন, বুঝতেন আন্তরিকভাবে। তাই তিনি ১৯৭২ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের ঘোড়দৌড় বন্ধের পর বৃক্ষ রোপণ করে তৈরি করেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু ওয়াটার পলুশন কন্ট্রোল অর্ডিনেন্স-১৯৭৩ জারি করেন। পরিবেশ সংরক্ষণে সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনকে জাতীয়করণ ও আধুনিকায়ন করেন।

বাংলাদেশ নদী মাতৃক দেশ। নদীকে কেন্দ্র করে এদেশের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি গড়ে ওঠেছে। নদ-নদী বাঙালির অমূল্য সম্পদ এবং খাল-বিল, নদ-নদীই আমাদের সেচের মূল উৎস শক্তি। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নৌপরিবহন অব্যাহত রাখতে পলি অপসারণে বঙ্গবন্ধুর সরকার ড্রেজিং কার্যক্রম জোরদার করেন। ভারী জাহাজ চলাচলের নৌপথ সুন্দরবনকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে-এ আশঙ্কায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে লুপ কাটিং ড্রেজিংয়ের সাহায্যে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ঘষিয়াখালী থেকে রামপাল উপজেলার বেতবুনিয়া পর্যন্ত ৬.৫ কিমি. সংযোগ খাল খনন করা হয়।

তিনি ছিলেন কৃষকের বন্ধু। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘করাপশন আমার বাংলার কৃষক করেনা,করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ।’ তিনি কৃষকদের কথা চিন্তা করে কৃষি ঋণ মওকুফ, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার ও খাসজমির বিতরণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান যেমন কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, ইক্ষু গবেষণা প্রতিষ্ঠান. মৎস উন্নয়ন কর্পোরেশন সহ অনেক নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। কৃষি ক্ষেত্রে সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নতুন নতুন জ্ঞান অর্জন, কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং স¤প্রসারণের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে ‘বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার’ প্রবর্তন করা হয় ১৯৭৩ সালে।

 

মো. অহিদুর রহমান,
পরিবেশকর্মী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী , বারসিক

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

সর্বশেষ